মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২৫

জমে থাকা অন্ধকারের গল্প

জমে থাকা অন্ধকারের গল্প

শাশ্বত নিপ্পন

এ পাড়ায় বাস করে এর থেকে আর কোন পেশাতেই মমতাজ যেতে পারত? এখানে সব ধরনের মানুষের বাস। ডাক্তার, নাপিত, মাস্টার, নেশারু, মুদিওয়ালা, রিক্সাওয়ালা, দালাল, মোল্লা, পুরুত আরো কত। সকলেই ঝর ঝরে ভাতের মত এক হাঁড়িতে আছে- কেউ কারো গায়ে লেপটে যায় না সহজে। উপকারে অপকারে কোনটাতেই কেউ নেই। তবে দিন চলে যায়- বেধে থাকে না কারো। এই সমাজে একমাত্র মমতাজই ছিল গলগ্রহ। পুজোতে, ঈদে অথবা জুম্মা বারে যখন পাড়ার ছেলে-বুড়োরা পরিচ্ছন্ন কাপড় পরে পারমার্থিক চিন্তায় গদগদ হয়ে মন্দির-মসজিদে যায়, তখন মমতাজই একমাত্র ‘ধুমো ঢেকুড়’। পরিচ্ছন্ন এই মহল্লার বিষফোঁড়া। তবে যতই সমস্যা হোক, তাই বলে তো এই দুর্মল্যের বাজারে মমতাজের ভরণ পোষণের ভার নেওয়া শেখ সৈয়দ অথবা চক্রবর্তী সাহা কারো পক্ষেই সম্ভব না। তাই বিষফোঁড়াটি তিন রাস্তার মোড়ে যেখানে মোচড় দিলেই বামে পড়ে নতুন গজিয়ে ওঠা মসজিদ আর একটু সামান্য এগুলেই ডানে আছে শতবর্ষী শিবমন্দির; সেখানে থেকেই যায়। বরং বড় হতে থাকে। সময়ের দোলাতে অশ্লীল বিষয়টি পাড়ার লোকের গা সয়া হয়ে যায় ক্রমেই। এখন মমতাজ, “বেশ্যার বেটি বেশ্যি; মর্জিনার বেটি মমতাজ।” অন্যদিকে মমতাজ তার গায়ের ইস্পাত কালো রং আর বিশাল বুককে পুঁজি করে পৃথিবীর প্রাচীনতম পেশায় নেমে দু’বেলা ভাত খায়, সুগন্ধি সাবান মাখে এমন কি “দারিদ্র বিমোচন সংস্থা” থেকে লোন নিয়ে একটা একুশ ইঞ্চি রঙিন টেলিভিশন আর একটা চৌকি কিনেছে- এখন প্রতি সপ্তাহে সে কিস্তি শোধ করে; জরদা নিয়ে পান খায়। সূর্য ডুবলে চারপাশে সুগন্ধি জরদায় খোসবু ছড়িয়ে একটা নিবু নিবু লাইট পোস্টের নিচে মমতাজ প্রায়ই দাঁড়ায়; একা। পাড়ার মুরুব্বি মোজাম্মেল, করিম বক্স, হারান ঘোষরা বলে, “ওর মা য্যামন ঔ ত্যামন- ছি!”



সময় বদলেছে। এখন যে কোন পথে রোজকার করতে হলে ম্যানেজ করতে হয় বিভিন্ন দিক। মমতাজ কেও নানা দিক ম্যানেজ করতে হয় নানাভাবে। পুলিশকে সার্ভিস দিতে হয়, পাড়া মহল্লার উঠতি ছেলে ছোকরা দের দেখতে হয় কখনো- আর সহ্য করতে হয় করিম বক্সকে।



ওরা বলে তবে জোরে না- মিন মিন করে। যেন মমতাজের কানে না যায়। তবুও মমতাজ শুনতে পায় এই কানাঘোষা। নির্মম ফিসফিসানি, চুপ থাকে সে। কখনো বা বিড় বিড় করে বলে, “আমার মা তো খারাপ ছিল, তোরা তো ভাল মায়ির ছেলি- এ সব করতি আমার কি ভাল্লাগে? করি প্যাটের জন্যি; আমাকে খেতি দে না তুরা… দ্যাখ আমি এসব আর করবু না।” আবার খুব যখন কষ্ট হয়, তখন মমতাজ কাঁদে। সে কান্না কেউ দ্যাখে না; সেও কাউকে দেখাতে চায়ও না। অন্ধকার ঘরে বসে, মমতাজ কাঁদে। বাইরে তখন হয়তো হেমন্ত দুপুর- রোদ ঝলমল অথবা জোসনা মাখা রাত। ফসলহীন মাঠের মাঝে কোন রসেলা খেজুর গাছে কোন নিঃসঙ্গ টিয়া টিহি টিহি করে ডেকে ওঠে অকারণ। হিম ঝরানো উত্তরী হাওয়া রাতের শান্ত বাঁশ ঝাড়ে ভৌতিক শব্দ তুলে হারিয়ে যায় গভীর অন্ধকারে। রাত জাগা পাখি ডানা ঝাপটায়। মমতাজ কাঁদে। কেন যে কাঁদে, কে জানে! এই কান্নার কারণ হয়তো সে নিজেও জানে না। গোপন কুটরি থেকে মা মর্জিনার জীর্ণ ছবিটা বের করে নিঃশব্দে। তারপর শূন্য দৃষ্টি নিয়ে দেখতে থাকে। একসময় ‘মা মা মাগো’ বলে ডুকরে কেঁদে ওঠে সে। দূর আকাশে শুক তারার মত মিলিয়ে যাওয়া বেবুশ্যি মাগিটা মুহূর্তে মা হয়ে যায়। মর্জিনা মরেছে অনেক দিন হল। খুবই রসনা বিলাসী ছিল সে। কিন্তু কপালের নিষ্ঠুরতা হল এই যে, খাবার জুটতো না মোটেও। খাবার দু’মুঠো ভাতের জোগাড় করতে আদিম পথে নামতে হয় মর্জিনাকে, তার যুবতী বয়সেই। দিন তারিখ কেউ লিখে রাখেনি। তারপর কিভাবে কখন জানি সে তথাকথিত গভীর পঙ্কিল এই নির্জন পথের যাত্রী হয়ে গেল। পরবর্তীতে ক্ষুধার যন্ত্রণা মিটেছে অবশ্য। তবে কোন পাপ বোধও কাজ করেনি মর্জিনার মধ্যে। তখন এই পাড়াপতিরা খুব বেশি আওয়াজ করতো না। কারণ মর্জিনা এই আঁধার পথে নির্জন যাত্রী হলেও সেই পথে এই পাড়াপতিদের সাথে প্রায়ই দেখা হত সঙ্গোপনে। অমাবশ্যার গভীর অন্ধকার পাড়াটাকে গ্রাস করলে মর্জিনার ঝাঁপের দরজায় টোকা দেয় কখনো মোজাম্মেল, হারান আবার কখনো ফকির বক্সরা। ঝাঁপ সামান্য ফাঁক হতেই কেরসিনের দুর্বল আলোতে ওদের মুখগুলো বড়ো অচেনা ঠেকত মর্জিনার কাছে। মনে হত এগুলো যেন সূর্যের আলোতে দেখা পরিচিতি মানুষের কঙ্কাল। করিম বক্স গদগদ হয়ে বলত, “মর্জিনা রে তুই হলি, পৌষের রাতের কাটকয়লার আগুন! একটু শরীল না তাতালে হাজার ন্যাপেও জাড় ভাঙে না।” মর্জিনা খিল খিল হাসত। সেই হাসিতে মমতাজের ঘুম ভেঙে যেত প্রায়ই। অভুক্ত পেটের ঘুম গাঢ় হয় না কখনো। ঘুম জড়ানো চোখে কেরসিনের অবছা আলোতে সে দেখত একদল দাঁতাল বুনো শুয়োরের আদিমপনা। গোটা ঘর জুড়ে থাকত এক ধরনের চাপা গোঙানি। শিশু মমতাজের মনে হত, গোটা ঘরটা মনে হয় দুলছে; মনে হত একদল পিশাচ তার চারপাশে হল্লা করতে করতে সে মূহুর্তে এক টুকরো তন্দ্রা আবার ঝুপ করে ঝরে পড়ত মমতাজের চোখের পাতায়। পরদিন মমতাজের কিছুই মনে থাকত না। যেন রাতে সে কোন একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছিল। মমতাজ দেখতো মা ঘুমাচ্ছে বেঘোরে। তার বুক কেঁপে উঠত অজানা আশঙ্কায়। মা বেঁচে আছে তো? মমতাজ পরম মমতায় মায়ের গায়ে হাত রাখে, তারপর আশঙ্কা জড়ানো গলায় ডাকে, “মা, মা”। আরো বার কয়েক ডাকার পর মর্জিনা উত্তর করে বিরক্ত গলায়; “কি হল?” মমতাজের বুক থেকে আশঙ্কার পাথর নেমে যায় এ আশায় যে, মা এখনো মরেনি। মমতাজ বলে, “মা খিদি লেগিচে।” মর্জিনা বিছানা না ছেড়েই বলে, “মারে শরীলটা খুব ব্যাথা; এই নে ট্যাকা; বাজারে গিয়ি এক কেজি আটা নিয়ি আয়- ধাপড়া ভেজি দেব… মমতাজের বুকটা ছিঁড়ে যায়। মুচড়ে ওঠে- “মায়ের শরীলডা ভাল না! গায়ে ব্যাথা।”



রাত গভীর হলে আগে সে টোকা দিত মর্জিনার ঝাঁপে এখন টোকা দেয় মমতাজের টিনের দরজায়। আগে তার মুখে লেগে থাকত জরদার গন্ধ এখন লেগে থাকে বাংলা মদের ঝাঁঝাঁলো স্বাদ। তার কালো বয়স্ক দলদলে শরীরটাকে প্রশয় দিতে মমতাজের গা ঘিন ঘিন করে- কিন্তু তার পেমেন্ট ভালো



মলিন টাকাটা হাতের মুঠোয় চেপে ধরে বাজারের দিকে পা বাড়ায় মমতাজ। তখন মমতাজের বয়স আর কতই বা। সবে সে বড় হতে শুরু করেছে। ছিপছিপে হয়ে ঢ্যাঙা আকৃতি ধারনের পূর্বাবস্থা হয় তো। তার হাড় জিরজিরে শুকনো বুকটার দুই পাশে বুনো আমড়ার মত দু’টো মাংসপিণ্ড কেবল মাথা বের করে দুনিয়া দেখার অপেক্ষা করছে। এখনো সে আদুল গায়েই সাচ্ছন্দ্য বোধ করে- হয়তো এমূহুর্তেও সেই তার করতো; কিন্তু মর্জিনা খেঁকিয়ে সেই দিন থেকে মমতাজ অনেক কিছুই বুঝতে শিখে যায়। শরীল, শরীলের ব্যাথা, দোকানির সোহাগ এবং সোহাগে বাধা না দিলে আয় হয়। বাধা না দিলে হোটেলের তেলে ভাজা পরোটা খাওয়া যায়। সকলের ফাঁকা বাজারের দোকানি মমতাজকে দোকানের ভিতরে ডেকে নেয়। সোহাগ করে। তার ময়লা জামার ভিতরে দোকানির বয়স্ক আঙ্গুলগুলো কিলবিল করে বেড়ায়; মমতাজের বিচিত্র অনুভূতি হয়। গলা শুকিয়ে আসে; কি করবে কি বলবে বুঝতে পারে না মমতাজ। কি ঘটছে তাও বুঝতে পারে না সে। পরে দোকানি টাকা দেয়। ক্রমেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে মমতাজ। সকালে কখনো সন্ধ্যায়, নির্জন দুপুরে সে দোকাননিকে সোহাগ করতে দেয়। সোহাগ শেষে টাকা পায় মমতাজ। তেলে ভাজা পরোটা কখনো কখনো, মমতাজের শুরুটা এভাইে। পরবর্তীতে মর্জিনা আঁধার অচিন রাজ্যের বাসিন্দা হওয়ার পরও একবারে পথে পড়ে যায়নি মমতাজ। কিম্ভুত কদাকায় অদ্ভুত আকৃতির এই গ্রহের বিচিত্র এই সমাজে বেঁচে থাকার মন্ত্রটা মমতাজ রপ্ত করেছিল সেই শিশুকালেই।

সময় বদলেছে। এখন যে কোন পথে রোজকার করতে হলে ম্যানেজ করতে হয় বিভিন্ন দিক। মমতাজ কেও নানা দিক ম্যানেজ করতে হয় নানাভাবে। পুলিশকে সার্ভিস দিতে হয়, পাড়া মহল্লার উঠতি ছেলে ছোকরা দের দেখতে হয় কখনো- আর সহ্য করতে হয় করিম বক্সকে।

করিম বক্সের এখন এলাহি অবস্থা। দোতালা বাড়ি; নিজে সাবেক মেম্বার; বাজারে ব্যবসা, রাজনীতি ইত্যাদি ইত্যাদি। ছেলেরা লায়েক হয়েছে। বৌটা মরেছে বেশকিছুদিন, নানাবিধ যন্ত্রণায়। সবকিছু পরিবর্তন হলেও করিম বক্সের পৌষের রাতে ময়লার আঁচে শরীল তাতানোর অভ্যাসটা এখনো যায়নি। শুধু পাত্র বদলেছে মাত্র। রাত গভীর হলে আগে সে টোকা দিত মর্জিনার ঝাঁপে এখন টোকা দেয় মমতাজের টিনের দরজায়। আগে তার মুখে লেগে থাকত জরদার গন্ধ এখন লেগে থাকে বাংলা মদের ঝাঁঝাঁলো স্বাদ। তার কালো বয়স্ক দলদলে শরীরটাকে প্রশয় দিতে মমতাজের গা ঘিন ঘিন করে- কিন্তু তার পেমেন্ট ভালো। তাছাড়া এ লাইনে থাকতে হলে করিম বক্সের মত বয়স্ক মানসিক লম্পটদের সহ্য করতেই হয়। এই তো সেদিনই পাড়ার সম্ভ্রম মর্যাদা ঠিক রাখতে এবং পাড়ার উঠতি ছেলে ছোকরা ভোটারদের পক্ষে রাখতে করিম বক্সই এসেছিল মমতাজের বাড়ি দিনের বেলায়। সাথে জোনদশেক লোক। বক্স বলল, “শোন মমতাজ, এটা ভদ্দোর লোকের পাড়া; এখানে এসব চলবি না; তাছাড়া এ পাড়ার ছেলেরা বড় হয়িচে। তুই অন্য জায়গায় উঠি যা।” খুবই যৌক্তিক কথা। ছেলেরা বড় হচ্ছে। মন দুষ্টু পথে ধায় বেশি। ওরা স্কুল কলেজে যায় না; সারাদিন মোবাইলে ‘নীল ছবি’ দেখে চিপায়-চুপায় বসে; টেলিভিশনে হিন্দি নায়িকার খোলাবুক দেখে- এ সব করিম বক্স আটকাতে না পারলেও, পাড়ার সম্ভ্রম তো বাঁচাতেই হয়। আর এই ছেলেগুলো রাতে সিনেমা, অবসরে নীলছবি দেখে যদি তাদের কচি চোখে মমতাজকে ঝিকিমিকি ঝগতের নায়িকা মনে হয় যায়- তাহলে তো করিম বক্সদের মত লোকদের সে পাড়ায় বসবাসই দায়। সামান্য গলা খেঁকরে করিম বক্স আবার শুরু করে, “তাছাড়া এ সব এছলাম বিরোধী কাজ এখানে চলবি না- কি বল গো তুমরা?” উপস্থিত সকলেই সমস্বরে সম্মতি জানায়। মমতাজ সর্বশক্তি দিয়ে সকল রাগকে চেপে রেখে; খুব নরম স্বরে বলে “জ্বে, কথা ঠিক; চলে তো যাবুই; তে আপনার একটা গেঞ্জি আমার ঘরে ছেলো চাচা ওটি কখুন নেবেন”- ব্যাস! জোঁকের মুখে লবণ। উপস্থিত সকলে মুখ চাওয়াচায়ি করে। কেউ কেউ মুখ টিপে হাসে। আমতা আমতা করে করিম বক্স দলবল নিয়ে মমতাজের দরজা থেকে সহজেই সরে পরে। তারপর আর পাড়ার সম্ভ্রম রক্ষায় কেউ স্বতপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসেনি। মমতাজও পেশা পাল্টানোর তাগিদ অনুভব করেনি। সূর্য উঠেছে আবার বিদায় নিয়েছে সময়মত। মমতাজের দিন চলে গেছে। রাতের আঁধারে তার সাথে করিম বক্সের দেখাও হয়েছে যথারীতি। করিম বক্স আসার দিনে মমতাজ আর কাউকে এ্যলাও করে না। সে মধ্যরাত পর্যন্ত থাকে। দু’টোপলা বাংলা মদ শেষ করে, আধ খাওয়া মাংসের প্যাকেট ফেলে রেখে টলমল পায়ে থপথপ করে বের হয় মমতাজের ঘর থেকে। আলো আঁধারে তাকে পুরনো পরিত্যক্ত ঘরের ইটের ঢিবি থেকে বেরিয়ে আসা গুঁইসাপের মতো দেখায়, যার পিঠে ছোপ ছোপ দাগ।

যাওয়ার আগে লুঙ্গির খোট থেকে টাকা দিতে দিতে মমতাজের চিবুক নেড়ে দ্যায় করিম বক্স। সোহাগ করে; বলে, “আমি হলাম, তোর বাঁধা নোক: দু’পুরুষ ধরে তোদের পুষছি; তোর মা-র কাছেও যাতাম- তোর কাছেও আসি।” কথাগুলো বলতে বলতে বিশ্রীভাবে বুকে জমে থাকা পুরনো শ্লেষা মুখে এনে থুঃ করে দূরে ছিটিয়ে ফেলে। মমতাজের সারা শরীর জ্বলতে থাকে-এই মূহুর্তে নিজেকে বড় অপবিত্র নোংরা মনে হয়। জীবনের প্রতি বড় ঘেন্না জন্মে। করিম বক্স আবার শুরু করে, “তবে তোর মা জানতো কিভাবে আনন্দ করতে হয়; ওফ! তাছাড়া… কথা শেষ হওয়ার আগেই মমতাজ সরে আসে ভিতরে। তার শরীর কাঁপছে। আজ অনেক দিন পর শূন্য ঘরে নিজেকে বড় তুচ্ছ মনে হল। মনে হল সে পতিত- পতিতার মেয়ে- বেশ্যা মায়ের কোলে জন্ম নেওয়া এক ‘মেয়ে’ না ‘বেশ্যা’। চকিতে তার মনে হয়, তার আর কোন পরিচয় নেই, জন্মদাতার বৃত্তান্ত নেই, কোন ইচ্ছে-অনিচ্ছে নেই, তার একটায় পরিচয় সে খানকির মেয়ে খানকি। মমতাজ হু হু করে কেঁদে ওঠে হঠাৎ। “ও মা গো” বলে আছড়ে পড়ে তার নোংরা বিছানায়। কান্নার দমকে তার ইস্পাত কালো শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে। বাইরে তখন ঘোর নিশুতি। অজানা কোনো বাঁশবাগানে হিম ঝরানো বাতাস দোলা দিয়ে যায়। আচমকা বাতাসে দুটি বাঁশে ঘর্ষণ লেগে ভৌতিক শব্দের সৃষ্টি হয়- সে শব্দ ছড়িয়ে পড়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন এই তথাকথিত পাড়ার অলিন্দে অলিন্দে। আর সেই বাঁশ বাগানে ঘাপটি মেরে থাকা রাতজাগা পাখিটি ঝুপ করে উড়ে যায় অন্ধকারে ডুবে থাকা মহল্লার উপর দিয়ে।

আজ সকাল থেকেই কোন কারণ ছাড়াই মমতাজের মন ‘কু’ ডাকছে। কোন কাজে মন বসাতেই পারছে না সে। মনটা কেমন যেন তেঁত স্বাদে ভরে আছে। তবে কাজ বলতে তেমন কোন কাজ নেই তার; ঘরের নিতান্ত টুকিটাকি আর নিজের সামান্য কিছু।
সারাদিনই আলস্যে কাটে মমতাজের। কাজ নেই, সঙ্গী নেই, সমাজে থেকেও মমতাজ কেমন যেন বিচ্ছিন্ন নির্জন লোকালয়হীন দ্বীপ হয়েই থেকে যায়। কার্তিক মাসের প্রায় শেষ; বেলা পড়ার সাথে সাথে উত্তরী বাতাস জোর দেয়। হীমেল বাতাস। জাড় লাগে। দুপুরের পর আর বেলা থাকে না। পড়ন্ত বিকেলে করিম বক্সের খাস চামচা শুকুর আসে পোকায় খাওয়া দাঁত বের করতে করতে।



মধ্যরাতের তাদের ঘরে বুনোশুয়োরের উদ্দামতা, সকালের নির্জনতায় দোকানির নোংরা আঙ্গুল গুলো মূহুর্তে মমতাজের শরীরের উপরে কিলবিল করে ওঠে। চোখের নিমিষে মমতাজ তুলে নেয় তার নিজের নিরাপত্তার জন্য চৌকির নিচে একান্তে রাখা নিতান্ত নিরাপরাধ ধারাল দা-টা। আবছা আলোয় দায়ের ধারাল দিকটা বাড়ন্ত গোখরে সাপের চিরল জিভের মত ঝিলিক দিয়ে ওঠে



শুকুরকে দেখে গা জ্বলে যায় মমতাজের বরাবরই। শুকুর অযথা বলে; মুখ-খিস্তি করে; ছেঁড়া জামার পকেট থেকে অযথা টাকা বের করে মমতাজের সামানে গুনতে থাকে। মমতাজের গায়ে হাত ঠেকিয়ে কথা বলে- মমতাজ এসবের ঈঙ্গিত কি, তা বোঝে। কিন্তু শুকুরের সাথে তার মন চায় না- যদিও তার ইচ্ছে অনিচ্ছোর কোন মূল্য নেই, তারপরও। শুকুর গোপনে খবর দিয়ে গেল, “আইজ বড় মিঞা আইসবি,” “হেঁ হেঁ হেঁ; একটুক্ষণ থাকবি, হে হে হে; রাইতে আইসবি- তুই বাড়ি থাকিস ক্যান্ত।” মূহুর্তে মমতাজের চোখে ভেসে ওঠে, পুরনো স্তুপ থেকে বেরিয়ে আসা গোসাপ-দীর্ঘদিন অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকার কারণে যার পিঠে জমেছে ছাপ ছাপ অন্ধকার আর চোখে চারপাশ অন্ধকার কারার দুর্বার তৃষ্ণা। থলথলে দেহ; মুখে বাংলা মদের ঝাঁঝাঁলো গন্ধ। হঠাৎই মমতাজ উপলব্ধি কওে দৃঢ়ভাবে, সে এই লোকটাকে ঘৃণা করে। হয়তো এর কোন কারণ আছে অথবা নেই। সহ্য হয় না তাকে। তবু দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করতে থাকে কুৎসিৎ গো-সাপটার জন্য। রাত ধীরে ধীরে গভীর হতে থাকে। অগ্রহায়নের হিম ঝরানো উদার বাতাস ধান কাটা বিষন্ন বিলের বুক বেয়ে এই নিরুত্তাপ মহল্লার উপর দিয়ে বয়ে যায় শন্ শন্।

সত্তা মাফলারে মুখ ঢেঁকে করিম বক্স যখন মমতাজের টিনের দরজায় টোকা দিল তখন রাত গভীর হয়েছে। চাঁদ প্রায় মাঝ আকাশে; ঝি ঝি পোকার দল ক্লান্ত হয়ে এখন শান্ত। করিম হঠাৎ আকাশের দিকে তাকায়; রাতের আকাশের ভাসমান মেঘ রাশি তাকে মুগ্ধ করে। তার মনে হয় এই আকাশ আর এই জমিনের মাঝে কতটা সময়। কত উত্থান পতন সে পার করে দিল। চোখের সামনে কত পাল্টে গেল পায়ের নিচের এই জমিন- কিন্তু আকাশটা আছে আগের মতই; এতটুকু বদলায়নি; বিড়বিড় করে উঠে করিম বক্স “শালা পায়ের তলে যারা থাকে তারাই পাল্টে যায় দ্রুত।” একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বিশ্রী নাকের বড় বড় ফুটো দিয়ে। সাথে কটু ঝাঁঝাঁলো গন্ধ। করিম বক্স মনে হয়, নেশা খাওয়ার জন্য আজকের এই নিশুতি বড়ই যুৎসই। হঠাৎ তার নাকে তিব্বত স্নোর গন্ধ আর সুগন্ধি তেলে ভেজান চুলের সুবাস দোলা দেয়; নিঃশব্দে দরজা খুলে মিষ্টি হেসে মমতাজ ঢোকার পথ সুগম করে দেয়। জোসনার আলোয় মমতাজকে আসমান থেকে নেমে আসা হুরপরীর মত দেখায়। করিম বক্স আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে না।

করিম বক্সর মনে হয়, আজ নেশাটা ধরেছে ভাল। আজ বাংলা দিয়ে গিয়েছে বর্ডার পার্টি। মালটা ভাল। তার গা দুলছে, মনে হচ্ছে চারদিকের মাটি কাঁপছে; এই ভার মাটি আর সহ্য করতে পারছে না। সে মমতাজের চৌকিতে বসে পরে। মমতাজ আজ একটা অপেক্ষাকৃত পরিস্কার চাদর বিছিয়েছে চৌকিতে। আর দু’ঢোক গলায় নিয়ে বক্স শরীর দুলিয়ে ঘর আর বাইরের জমাট রক্তের মত কাঁলচে নিস্তব্ধতা কাঁপিয়ে হেসে ওঠে। তারপর বলে, “শুন, তোর বংশ আমি চালাই; তোর মাকে আমি চালাতাম।” করিম বক্সের গলায় জড়িয়ে আসে আবার বলে সে, “মর্জিনা রে মর্জিনা। সে দেখতে কালো, কিন্তুক গানে আছে না, “বন্ধু আমার চিকন কালো, প্রেম করিতে লাগে ভাল…।”

পাথরের মূর্তির মত, কথা শুনে যায় মমতাজ। শুনতে বাধ্য হয়। শুনতে ইচ্ছে হয় না মমতাজের তারপরও শুনতে হয়। তার আবার মনে হয়, তার কোন ইচ্ছে নেই, অনিচ্ছা নেই, ‘না’ বলা সাধ্য নেই- করিম বক্সের নেশা ক্রমেই সপ্তমে চড়ছে। সে অসংলগ্ন গলায় আবার শুরু করে, “শালা দুনিয়াটা কাঁপচি; কাঁপুক; আমি ঠিক আছি…”। এক ঝটকায় সে তার পাঞ্জাবীটা খুলে ফেলে। তারপর কালো কুচকুচে থলথলে শরীরটা নিয়ে জড়িয়ে ধরে মমতাজকে। আর তখন মমতাজের মনে হয়, সে মর্জিনা বেশ্যার মেয়ে মমতাজ বেশ্যা, যার বাপের নাম জানা নেই। মনে হয় একটা কালো কুৎসিত গুঁইসাপ তার বিশ্রী শরীর দিয়ে গিলে খেতে চাইছে তাকে।
অল্পতে ক্লান্ত হয়ে, করিম বক্স চৌকিতে শুয়ে পড়ে চিৎ হয়ে; তারপর বলতে থাকে, “উফ! জানিস রে মাগী, তোর মা, মর্জিনা জানতুক কি করে বিটা ছেলে কে ঠান্ডা করতে হয়; আনন্দ দিতে হয়”

কথাগুলো গনগনে শলার মত মমতাজের কানের পর্দা ভেদ করে ব্রহ্মতালুতে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়। মমতাজ বেসামাল হয়ে পড়ে। তার মধ্যে হঠাৎ দীর্ঘদিনের জমে থাকা আগুন জ্বলে ওঠে। তার চোখে ভেসে ওঠে তার মার ক্লান্ত শরীর, মধ্যরাতের তাদের ঘরে বুনোশুয়োরের উদ্দামতা, সকালের নির্জনতায় দোকানির নোংরা আঙ্গুল গুলো মূহুর্তে মমতাজের শরীরের উপরে কিলবিল করে ওঠে। চোখের নিমিষে মমতাজ তুলে নেয় তার নিজের নিরাপত্তার জন্য চৌকির নিচে একান্তে রাখা নিতান্ত নিরাপরাধ ধারাল দা-টা। আবছা আলোয় দায়ের ধারাল দিকটা বাড়ন্ত গোখরে সাপের চিরল জিভের মত ঝিলিক দিয়ে ওঠে। করিম বকশ বলেই চলে অসংলগ্ন গলায়, ‘তোর মা, মর্জিনা, মাল খাওয়াতুক আবার নিজেও খেতুক- উহফ! কেন্তো তুই সেরকম পারিসনি।” মমতাজ আর দেরি করে না। তবে কেন করে না, সে জানে না। মুহূর্তে সে করিম বক্সর কালো থলথলে শরীরটাকে ফালা ফালা করে ফেলে। ঘোর লাগা চোখে মমতাজ দেখতে পায়, ভয়াল দর্শন কুৎসিট একটা গোসাপ নিঃশব্দে নেমে যাচ্ছে তার মা, মর্জিনার ব্যাথা হয়ে যায় শরীরের উপর থেকে।

তখন বাইরে থমকে থাকে অন্ধকারের দোলা দেয় অগ্রহায়ণের হিম ঝরানো বাতাস। ঝিম দিয়ে থাকা রাত জাগা পাখিটি অদ্ভুত শব্দ করে ডানা ঝাপটায়।

লেখক পরিচিতি

শ্বাশত নিপ্পন
শ্বাশত নিপ্পন
কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক
এ বিভাগের আরও লেখা

ছোটগল্প

গল্প

ফেসবুক পেইজ

বিজ্ঞাপন

spot_img

জনপ্রিয় লেখা