ভাবনার দুয়ারে
মেহনাজ মুস্তারিন
কতকিছু যে মাথায় আসে সারাদিন। অনেক ভাবনা অনেক খেয়াল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে কতো এলোমেলো ভাবনাই না ভাবি। বয়স ৫৪ ছুঁই ছুঁই তাতে কি এখনো ইচ্ছে করে কারো মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হই। আজ এমন তর ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো একজন প্রেমিকা তার প্রেমিকের কাছে কোন বিষয়গুলো বেশি প্রত্যাশা করে। যা পেলে তার জীবন পূর্ণতা পায়? এটা হয়তো একেকজনের কাছে একেক রকম। মানে চাহিদাগুলো ঠিক ভিন্ন রকম। আচ্ছা সবধরনের গুন কি একজন মানুষের মধ্যে পাওয়া যায়? যায় না। দু’একটা পছন্দ যখন একে অপরের সাথে মিলে যায় তখনি হঠাৎ কোন এক ভোরের আলো দু’জনের চোখ আলোকিত করে। সেই আলোর কিরণ তাদের সবকিছু দেখতে শেখায়। ভালো হোক বা মন্দ অথবা দৃশ্যত দেখা যায় না এমন অনেক কিছু। একে অপরের জানার আগ্রহ বাড়তে থাকে। যতই দিন যায় নতুন কতোকিছু ভর করে দু’জনের দখলে। বেঁচে থাকাটা যেন কত আনন্দের হয়ে ওঠে। জন্মের গুরুত্বটা প্রতিমুহূর্তে উপলব্ধি করে তারা। সেই ভালোলাগার কোন এক ছায়াতলে মনে হয় একজন প্রেমিকার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার প্রেমিকের আত্নবিশ্বাস, নাহ! শুধু এতটুকুতে মন ভরে না প্রেমিকার। তার মনে হয় আরও একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তা হলো সততা, সেটা থাকাও জরুরী। তারপর চশমার কাচ থেকে চোখ তুলে কি যেন দেখবার চেষ্টা করে সে– হুম, দেখতে পায় সাহস নামক শক্তিশালী কিছু একটা। হ্যাঁ, একজন প্রেমিকের সাহস থাকতে হবে যাতে তার সঙ্গী কোন অবস্থায় অনিশ্চয়তায় না ভোগে। আচ্ছা সে যদি বুদ্ধিমান না হয় তাহলে কি এসব গুনাবলী তার মধ্যে থাকবে? ধরলাম সব-ই তার আছে কিন্তু তার যদি কোন মনোজগৎ না থাকে, যদি সে প্রেমের মর্ম না বোঝে,মনের ভেতরে যদি কোন ছন্দ দোলা না দেয় , তাহলে কি সে প্রেমের রঙ, রূপ, গন্ধ টের পাবে? পাবে না। তাহলে একজন প্রেমিকের মনের গভীরে থাকতে হবে বিশাল এক আকাশ। যে আকাশের ছায়াতলে থাকবে দুজনেরই শিকলভাঙা আলোর সুখ– হঠাৎ চোখের পাতা বুজে আসলে জেগে থাকার অর্থ যেন খুঁজে পায় তার মনের আকাশ। একটু ছন্দ মিলিয়ে যদি বলি…
যখন আসি তোমার কাছে
আকাশ থাকে বুকের মাঝে…
চুপটি করে লুকিয়ে পড়ি
জড়ানো আদর নীল জলে…
আমার ব্যথা তোমার বোধে
জ্যোৎস্না হয়ে ঝরে ওগো তীমির রাতে।
এভাবেই একজন প্রেমিকা খুঁজতে থাকে প্রেমিকের উষ্ণতা। শব্দের গভীর তট থেকে তুলে আনে ঝিনুক। গাঁথতে থাকে মালা সাধতে থাকে সুর। প্রতিটি পদচিহ্ন কান পেতে শুনতে থাকে নিরবে এই বুঝি এলো । এই বুঝি ডেকে গেল বসন্ত দুয়ারে। অথচ বাস্তবতায় আমরা কি দেখি… মন এবং শরীর দু’জনি ভিন্ন অথচ তাদের বসবাস একসাথে চিরোটাকাল। এদের মাঝে নিজেদের খুঁজে পাওয়া কিন্তু সহজ কথা নয় অনেকটা ধাঁধার মত। একটা জীবন শেষ হয়ে যাবার পরেও মানুষ সেই পরিতৃপ্তির খোঁজে রাত দিন হাঁটতে থাকে জানা-অজানার পথ ধরে । জীবন আসলে কোথাও সম্পূর্ণ নয়। বরং যেটুকু স্বস্তির সন্ধান আমরা পাই তা হলো হাওয়া। এই হাওয়ার দোলায় যতটুকু নিজেদের ভাসিয়ে রাখতে পারি সেখানেই পূর্ণতা। এর পরেও যদি প্রেমিক প্রেমিকার একাকী মনে হয় মনে হয় তার প্রিয়জন ঠিক তার মনের মতো নয়। কিছু দূরত্ব আছেই দু’জনের মাঝে তবু্ও বলবো সেই দূরত্বের একাকীত্বই যেন তাদের সম্পদ হয়ে উঠে সেটাই যেন স্বাতন্ত্রের সাধনা হয়ে উঠে। মনের ভেতর থেকে একটা তেজ একটা জোর উপলব্ধি যেন তখনো তাদের ডেকে বলে,
ইচ্ছে করে আবার যদি ঈদের জামাটা লুকিয়ে রাখতে পারতাম! মেহেদি পাতার জন্য এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়িয়ে অবশেষে অনেক রাত অবদি হাতে মেহেদি দিয়ে অঘরে ঘুমিয়ে পড়তাম। সকালবেলা উঠে দেখতাম লেপ্টে গেছে হাত সেই সাথে বিছানার ছাদরের যা তা অবস্থা। ঈদ বলে বকা খাওয়া থেকে বেঁচে যেতাম হয়তো । ইচ্ছে করে আবারও ফিরে যেতে সেই ক্ষনে। ইচ্ছে করে কারো নজরে আসার জন্য বাড়তি সাজে নিজেকে সাজাই। খুব ইচ্ছে করে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেমপত্র পড়তে। তারপর কোথায় তা লুকিয়ে রাখব তা নিয়ে ভাবনায় নিজেই হারিয়ে যেতে ।
কবিতাকে সাথে নিয়ে উদাস হও হারাও হারিয়ে যাও গভীর থেকে আরও গভীরে। বয়সটা হয়তো এমনি। সবকিছু কেমন যেন খাপছাড়া। যা ভাবছি যা করছি সবই পরিকল্পনার বাইরে। ভালো-মন্দ ভাবনার মধ্যে না এনে এলোমেলো পথ ধরে হেঁটে চলেছি। আশে পাশে যাদের কাছের ভেবে নিয়ে হাত ধরে হাঁটছি সবটাই কেমন যেন সাজানো। মনে হচ্ছে ভরসার জায়গাটা কেমন যেন মেকি ঠিক ফেসবুকে দেওয়া জলজ্বলে ছবির মতো। একটার পর একটা পোস্ট দিয়ে যাওয়া কিন্তু কোনটায় যেন হৃদয় টানে না। কোন মায়া নেই। নেই কোন দরদ। নেই বিপদে ঝাপিয়ে এসে পাশে দাঁড়ানো। হাতটা আলতো করে ধরে বলা আমি আছি পাশে।
এভাবেই পথ চলতে- চলতে মাঝ বয়সে এসে গেছি। কেন জানি বিশ্বাস হয়না যে এতটা বয়স হয়ে গেল! এখনো নিজেকে তেমনি প্রান চঞ্চলতায় পরিপূর্ণ মনে হয়। নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের নেশা পেয়ে বসে। এখনো মনে হয় এক ছুটে চলে যাই মাঠে, ডাক দিই আমার ছোট বেলার সাথীদের গোল্লাছুট,বদনখেলা,লুকোচুরি,বিদ্যাখেলা, আরও কতো রকম খেলা যে খেলতাম নামগুলো এখন সচেতন ভাবে মনে করতে হয়। কেমন যেন হারিয়ে
যাচ্ছে স্মৃতি থেকে কতকিছু! আবারও ইচ্ছে করে হারিয়ে যাওয়া সবকিছু ফিরে পেতে। হারিয়ে যাওয়া সেই চমৎকার মুহূর্তগুলোই আজকাল বড়ো চঞ্চল করে তোলে। ইশ! কতো কিছুই না ইচ্ছে করে! ইচ্ছে করে পাশের বাড়ির বরই গাছে একটা ঢিল ছুড়ে দিই।। ঝর ঝর করে পড়বে বরই। আর এদিক ওদিক তাকিয়ে কোছায় কুড়িয়ে নেব সবগুলো। ইচ্ছে করে ছোট- ছোট গাছগুলোতে উঠেপড়ি সেই আগের মতো! ইচ্ছে করে পেয়ারা গাছে শক্ত একটা ডালে উঠেবসে পা দুলিয়ে খেলা করি পাখিদের সাথে । ইচ্ছে করে বান্ধবীদের সাথে দল বেধে পুকুরে গিয়ে দাপাদাপি করে আসি যতক্ষন না ক্লান্ত হই।
খুব ইচ্ছে করে অনেক দূরে পায়ে হেঁটে তেতুলের চাটনি কিনে আনতে।ইচ্ছে করে আবারও পুতুল বিয়ে দিই । জুতার বাক্সে পুতুলের ঘর সাজাই। দর্জির দোকান থেকে ছাট কাপড় কুড়িয়ে এনে পুতুলের জামা কাপড় বানাই। মাটি দিয়ে হাড়ি পাতিল বানিয়ে সযত্নে রোদে শুকাতে দিই । ইচ্ছে করে ডিম আর আলুর রান্না দিয়ে মজার সেই পিকনিক পিকনিক খেলা করি আর ক্যাসেট প্লেয়ার এ নচিকেতার গান বাজাই খুব জোরে -জোরে। ইচ্ছে করে দলবেঁধে স্কুলে যেতে। ইচ্ছে করে রেজাল্ট খারাপের তোয়াক্কা না করে রেজাল্ট বুক লুকিয়ে রাখার প্রানান্ত চেষ্টা করি। ইচ্ছে করে ইলেকট্রিসিটি চলে যাক, ঘন্টার পর ঘন্টা হাঁটাহাটি করি বাড়ির পাশের অলিগলিতে। তারপর যখন বিদ্যুৎ আসবে প্যাঁচার মতো মুখ করে বই সামনে নিয়ে রাজ্যের হিজিবিজি চিন্তা করি। ইচ্ছে করে আগের সেই রমজান মাস ফিরে পেতে। কতো মজাই না হতো। সেহেরির সময় নানা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে রোজদারদের ডাকতেন বিভিন্ন দল। খুব মনে পড়ে তাঁদের। মনে পড়ে ঠান্ডা পানির কি অভাব বোধই না হতো তখন। ইচ্ছে করে আবার যদি ঈদের জামাটা লুকিয়ে রাখতে পারতাম! মেহেদি পাতার জন্য এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়িয়ে অবশেষে অনেক রাত অবদি হাতে মেহেদি দিয়ে অঘরে ঘুমিয়ে পড়তাম। সকালবেলা উঠে দেখতাম লেপ্টে গেছে হাত সেই সাথে বিছানার ছাদরের যা তা অবস্থা। ঈদ বলে বকা খাওয়া থেকে বেঁচে যেতাম হয়তো । ইচ্ছে করে আবারও ফিরে যেতে সেই ক্ষনে। ইচ্ছে করে কারো নজরে আসার জন্য বাড়তি সাজে নিজেকে সাজাই। খুব ইচ্ছে করে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রেমপত্র পড়তে। তারপর কোথায় তা লুকিয়ে রাখব তা নিয়ে ভাবনায় নিজেই হারিয়ে যেতে । ইচ্ছে করে বৃষ্টির মধ্যে খালি পায়ে জমে থাকা পানিতে ছলাত ছল ছলাত ছল খেলতে। ইচ্ছে করে তোমাকে বলতে ভালোবাসি যা তখন বলা হয়নি। ইচ্ছে করে আবারও জীবনটাকে পাল্টে ফেলি । সমস্ত গাফিলতি গুলো ঝেড়ে ফেলে পড়ায় মন দিই । এখন বুঝি চেষ্টা করলে হোতাম কিছু একটা যা হবার ইচ্ছে ছিলো । ইচ্ছে করে তোমার সাথে একটি বার হলেও দেখা হোক যা বলা হয়নি তা বলতে বড্ড ইচ্ছে করে।ছন্দে আনন্দে বলতে ইচ্ছে হয়…
ইচ্ছেগুলোর থাকতো যদি পাখা
ডানা মেলে উড়ে যেতাম
তবেই হতো দেখা।
আসছি আমি বসে থাক
চুপটি করে ওগো
ইচ্ছেগুলো পূরণ করার
সাহস তুমি রেখ।
পড়ন্ত বেলার ইচ্ছেগুলো ইচ্ছেই থেকে যায়!
তাইতো আজ বারে বারে পিছন ফিরে চাই। হাত নেড়ে ইশারায় বলি,আমা পানে চাও ফিরিয়া দাঁড়াও নয়ন ভরিয়া দেখি।

