শুক্রবার, জানুয়ারি ১৬, ২০২৬

নিজের সাথে নিজের কথা

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে

বিধান সাহা

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা আর উত্তর দেবার খেলায় এই লেখাটা লিখিত হয়েছিল ২০২০ সালের ২৪ এপ্রিল কবি ও চিত্রী নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের আমন্ত্রণে। এটা অনেকটা সেলফির মতোই। লিখিত সেলফি। নিজেকে কিভাবে দেখতে ও দেখাতে চাইছেন, তেমন।

আয়না: কী রে, কেমন আছিস?

 আমি: ভালো আছি বলতে হয় বলে বলছি। নইলে বলতাম, এই বালের জীবন ভাল্লাগে না। এতো এতো ট্রাই করার পর যেইটারে ভালো রাখতে হয় বা ভালো থাকার ভান কইরা যাইতে হয়— সেই জীবন দিয়া কী করিব?

আয়না: ভান? তোর ধারণা অন্যরা ভান করে ভালো থাকার

আমি: তুমি চ্যাটের অ্যাক্টিং মারাইও না। তুমি নিজেও জানো সেইটা।

আয়না: আচ্ছা আচ্ছা রেগে যাস না। বল কী করলে তোর ভালো লাগতো?

আমি: বহুত কিছু। সেসব আর বলতে ইচ্ছে করতেছে না। তবে মাঝে মাঝে মনে হয় মানুষের গুয়ার কাপড় খুইলা জিগার নলা দিয়া যদি শপাং শপাং লাগাইতে পারতাম! মনে যা আসে মন খুইলা যদি সেসব বইলা গালাগালি করতে পারতাম!

আয়না: আচ্ছা, বল, তোর নিঃসঙ্গতার কী অবস্থা? সেই যে গুমোট অন্ধকার। রাত্রি জুড়ে বৃষ্টি আর বকুল ফুলের মায়ার ভেতর একদা আটকে গেছিলি, সেসব এখনও আছে?

আমি: কাজল শাহনেওয়াজের মতো আমারও বলতে ইচ্ছে করতেছে— ‘আরে শালা এটা তোদের ছিঁচকাঁদুনে রুমাল ভেজানো পদ্য লেখার নিঃসঙ্গতা নয়। জীবন যাপন এটা। আমি দেখতে চাইছি আমার এই শরীরটা কতো বিচিত্র রকম খাঁচায় টিকতে পারে।’ কিন্তু ভেবে দেখেছি, আমি আসলে ততটা সাহসী নই। ফলে অনেক কায়দা করে আমার নিঃসঙ্গতাকে হ্যান্ডেল করতে হয়। ‘আমি এক আগুন থেকে বাঁচতে অনেক আগুনে ঝাঁপ দেই।’

আর, রাত্রিগুলোকে এখন এক-একটা ভ্যাকুয়াম অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। আর সেই ঘণায়মান অন্ধকারে দুর্দান্ত এক ব্রহ্মতেজী ছাড়া নিজেকে কিছুই আর ভাবি না তেমন।

না, এখন আর বকুল ফুল নয়; আস্ত গাছ চাই। তোমাকে একটা কথা বলে রাখি, রমনার কিছু বকুল গাছের সাথে আমার সখ্য হয়েছে। অফিস থেকে ফেরার পথে রোজ তাদের সাথে কথা হয় আমার। তাদের কাছে আমার সমস্ত গোপন বলে দিয়েছি।

আমি: আচ্ছা, শোন, আমিই বলি— নানা রকম প্রশ্ন করছিস। তোদের এই সাহিত্যসমাজ এগুলোকে নিতে পারবে তো?

আয়না : তোর এমন মনে হইলো কেন?

আমি: তোমরা যে বালের সমাজে বাস করো, বালের সব সাহিত্যিক নিয়া, এইগুলারে তো আমার সাহিত্যিকই মনে হয় না। ভেক ধরা এক-একটা আত্মপ্রতারক। উপরে উপরে প্রগতিবাদীর ভান ধইরা দেখবা দুনিয়া উদ্ধার করতেছে। ভেতরে ভেতরে নোংড়ামির গোডাউন। আমি তোরে স্পষ্ট করে বলতেছি, এইগুলার অধিকাংশেরই দেখার চোখও তৈরি হয় নাই। শিল্পী-সাহিত্যিকদের এরা সঠিকভাবে ডিলও করতে পারে না। শিল্পীর শৈল্পিক অ্যাটিটিউডকেও এরা ধরতে পারে না। ভান ধইরা থাকে যেন সব বুইঝা ফালাইছে। এরা এখনও কারো হাতে ফুল দেখলে ভাবে, ‘উরিম্মাই, হাতে ফুল ক্যা? নিশ্চয়ই কাহিনি গোজ টু ফুলশয্যা!’

আয়না : এইটা কি তুই সরলীকরণ করে ফেললি না? সকলেই কি আর এক নাকি?

আমি: শোনো, তুমি ভালো করেই জানো আমি সংখ্যাগরিষ্ঠের কথা বলতেছি। যারা চক্ষুষ্মান তাদের তোমার মতো আবালের খোঁজ নেয়ার টাইম নাই। তাদের ধারে কাছেও তুমি ঘেঁষতে পারবা না। কারণ তাদের চারপাশ দখল করে আছে ভেক ধরা প্রতারকের দল।

আয়না : নিজের সম্পর্কে একটা সিক্রেট বল।
আমি : ক্যামেরা মিথ্যে বলে না, কিন্তু মিথ্যেবাদী ক্যামেরা ব্যবহার করে। — আমি সেই মিথ্যেবাদী ক্যামেরাম্যান।

আয়না: ভয় পাস কীসে?
আমি: আমাকেই বেশি ভয় পাই। কারণ ‘সিংহকে ঠিক তখনই সুদর্শন দেখায়, যখন খাবারের খোঁজে সে শিকারে বের হয়।’

আয়না: মানুষ না হলে কী হতে চাইতিস?
আমি: বোকার মতো প্রশ্ন করিস না। মানুষ না হলে কিছু হওয়ার ক্ষমতা আমার হাতে থাকতো নাকি!

আয়না: তোকে পলিটিক্যাল কোনো ইস্যুতে দেখা যায় না সেভাবে। কোনো প্রতিবাদ-ট্রতিবাদেও তেমন একটা দেখা যায় না। কেন বলতো!
আমি: এতো মৃত্যু, এতো নির্মমতা এখন আর ভাবায় না। বিশ্বাস কর, এখন আর ভাবায় না। স্রেফ এড়িয়ে যাই। কীসের প্রতিবাদ! কী হয় এদেশে প্রতিবাদ করে? অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের পরে লিখেছিলাম, ‘রাষ্ট্রের কাছে যে-কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার না চাওয়া, আস্থাহীন, এক ঊনমানুষের নীবরতাটুকুও অভিজিৎ হত্যার তীব্রতম প্রতিবাদ, এই রক্তাক্ত ফাল্গুনে।’

এই যে ‍বিশ্বজিৎ, আবরার বা তুহিনের হত্যাকাণ্ড বা আর যে যে হত্যাকাণ্ডের সংবাদ আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে— কী হয় এসবের প্রতিবাদ করে? বিচার হয়? বল, কয়টার বিচার পেয়েছিস? ব্যক্তিকেই তো ফোকাস করা হচ্ছে শেষমেষ।

বিচার হয় না। বিচারের ভান দেখানো হয়। বড় দুঃসময় যাচ্ছে রে ভাই!

আয়না : তাহলে কি প্রতিবাদহীন, নীরব হতে বলছিস সবাইকে?
আমি : এই যে বলছিলাম তোদের দেখার চোখ নাই। সেইটা এই কারণেই। প্রতিবাদেরও নানান ভাষা থাকে। একেকজন একেকভাবে তার প্রতিবাদ জারি রাখেন। এইটা আমার পথ।

আয়না : তোর লেখার করণকৌশল সম্পর্কে কিছু বলবি?
আমি : দেখ, যে লেখাগুলো আমি লিখেছি। সেগুলো আসলে কোনো লেখাই হয় নাই। আমার প্রকৃত লেখাগুলো সামনের দিনগুলোয় হয়তো আসবে।

ভেতরে ভেতরে আমার লেখা বহুধাবিস্তৃত, সর্বগ্রাসি এক বাবল হয়ে উঠতে চাইছে।

আয়না : এতো উদ্ধত দেখাচ্ছে কেন তোকে? তুই তো এমন না সচরাচর।
আমি : আত্মঅহংকার আর আত্মাবিশ্বাসের মাঝে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। এটা ঔদ্ধত্য নয়, আত্মবিশ্বাস। তাছাড়া, নিজেকে ওরকম একটা জায়গায় দেখতে আমার ভালো লাগছে। তোর সাথে কথা বলতে গিয়ে এটুকুতেই যা একটু শান্তি পেলাম।

আয়না : নিজের প্রেম নিয়ে কিছু বলবি?
আমি : আগেই বলেছি আমি মিথ্যেবাদী ক্যামেরাম্যান। যেসব ইমেজ এখন দেখাবো তা বিশ্বাস করলে নিজ দায়িত্বে করতে হবে।

আয়না : বল তবু; শুনি।
আমি : একইসাথে আমি শিকার এবং শিকারী। আমার অসংখ্য প্রেমিকা আছে। কারো কারো প্রেমে আমি পড়েছি। কেউ কেউ আমার প্রেমে পড়েছে। গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে। ছেড়ে যাবার পরই কেবল বুঝতে পেরেছি কোথায় শিকার ছিলাম কোথায় শিকারী। শরীর বেয়ে বেড়ে ওঠা আমি আসলে এক অন্তরলতা।

এখনও আমি অন্যের প্রেমে পড়ি এবং অন্যরা আমার প্রেমে পড়ে। জালাল উদ্দিন রুমির একটা কথা মনে পড়ছে— ‘যদি তুমি চাঁদের প্রত্যাশা কর, তবে রাত থেকে লুকিয়ো না। যদি তুমি একটি গোলাপ আশা কর, তবে তার কাঁটা থেকে পালিয়ো না, যদি তুমি প্রেমের প্রত্যাশা করো, তবে আপন সত্তা থেকে হারিয়ো না।’

আমি আপন সত্তার ভেতরে প্রেমের সন্ধানে মত্ত আত্মভোলা এক নিরুদ্দেশী। আমার স্থায়ীত্ব কম। গভীরতা বেশি।

আয়না : কী হতে চাস?
আমি : খুনি এবং সন্নাসী।
(দেখ, আবারও বলছি, তোদের এই সাহিত্যসমাজে আমার আস্থা কম। তোরা ফুল বললে ফুলই বুঝিস অথবা ভুলটা বুঝিস। যা বলছি সেগুলোর আক্ষরিক অর্থগুলোই নিস না অন্তত।)

আয়না : আর কিছু বলতে চাস?
আমি : তুই কি কি জানতে চাইছিস আমি বুঝতে পারছি। সত্যি কথা বলতে, ইচ্ছে করে না এসব বলতে। তবে… সুযোগ পেলে নিজেকে সুপারম্যান বানাতে চাইবো। লেখালেখিতে অনুপ্রেরণা বলে কিছু নেই আমার। যা আছে তার সবই উত্তেজনা। প্রিয় ধ্বনি শীৎকার। অবসরে নিজেকেই বেশি সময় দেই। সমমনাদের আড্ডায় আমি দুর্দান্ত রকমের স্বতস্ফূর্ত। নারীসঙ্গ আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। একইসাথে তারা মহামায়া, মমতাময়ী এবং মিথ্যেবাদী।

আয়না: আচ্ছা, নিজেকে মিথ্যে বলিস?
আমি: হ্যাঁ। অবশ্যই। এই যে এখানে যা বললাম সবই তো মিথ্যে। অস্তিত্বহীন। কিংবা এর সবই সত্য; অস্তিত্বময়। মিথ্যে বলে আদৌ কি কিছু আছে? জর্জ বার্কলে বলেছিলেন— ‘জগত আছে বলে মানুষ তা দেখে একথা ঠিক নয়, মানুষ দেখে বলে জগত আছে।’

আয়না: দেখ, আমি আর প্রশ্ন খুঁজে পাচ্ছি না। তুই নিজে থেকে কিছু বলবি?
আমি: অবারিত সবুজের মাঝে আমি এক উদ্ধত তালগাছ।

শ্মশান কাউকে ফেরায় না, প্রিয়তমো
আকাশে অনেক চিল—আগুন! আগুন!!

লেখক পরিচিতি

মানুষ ডেস্ক
মানুষ ডেস্ক
শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি মানুষের মনকে করে উদার ও কোমল। যে ব্যক্তি এগুলো হৃদয়ে লালন ও চর্চা করে সে কখনও সমাজবিদ্বেষী কাজ করতে পারে না। সাহিত্য বিভিন্ন যুগের ও বিভিন্ন গোত্রের সমাজ সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেয়। বিভিন্ন স্থানের ভাষা শিখতে সহায়তা করে। সাহিত্য মানব মনে প্রেম, বিরহ, সুখের অনুভূতি সৃষ্টি করে। অথচ শিক্ষার অভাবে আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মা-বাবা তাদের সন্তানদের শিল্প ও সাহিত্য পাঠে মন থেকে সম্মতি দেন না।
এ বিভাগের আরও লেখা

ফেসবুক পেইজ

বিজ্ঞাপন

spot_img

জনপ্রিয় লেখা