বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬

নিজের সাথে নিজের কথা

যেন আমি মাছের কুমার, অলৌকিক খিজিরের পানির সহগ

কাজী নাসির মামুন

স্বপ্নে একবার মাছ হইছিলাম। বানের পানিতে চরাচর ভাইসা গেছে। কয়েক ফুট তলায়া যাওয়া একটা বাড়ির পানিবন্দী মানুষের পায়ের ফাঁক দিয়া আমিও ভাইসা বেড়াইতেছি। সে কি আনন্দ আমার! না, কোনো মৃত্যুভয় নাই। দু:শ্চিন্তা নাই। একটা নিরীহ নিষ্পাপ সদানন্দময় অনুভবের মধ্যে আমি সাঁতরাইতে থাকলাম। নিজের খাইসলতের মধ্যে ওইরকম একটা নিখুঁত নির্ভার সুখ লেপ্টে থাকবো, ভাবছিলাম। জাইগা উঠার পর নিজের সিনার মধ্যে মাছের নিবিড় চাঞ্চল্য টের পাইলাম। কিন্তু সুখ না, আতঙ্ক ভর করলো। মাছের জীবনের মধ্যেই যদি থিতু হয়া যাইতো আমার হায়াত! কোনো গেরস্থ বউয়ের কোমল হাতের নিঠুরতা আমারে বঁটির মধ্যে কুটি কুটি কইরা ফেলতো। শরীরের টুকরা টুকরা অংশগুলা ভোজনব্যঞ্জনে শোভা পাইতো মানুষের ভাতের থালায়। মানুষের আস্বাদনে, তাদের তৃপ্তির অনন্যতায় আমার মওত গুরুত্বহীন হয়া পড়তো। কেননা মাছের জন্য কারো মায়া হয় না। তড়পানো মাছের জন্য কারো দিলের মধ্যে ভালোবাসা পয়দা হয় না। মাছের আয়ু মানেই এক অনিবার্য হাহাকার। রক্তাক্ত মাছ দেইখা কারো কোনোদিন মনে হইছে, আহা, মাছটার কি করুণ মরণ হইতেছে! ওরে আর কাইটো না, ছাইড়া দেও?



মনে হইছে সকল আক্কেল ডিঙায়া গেলে, সকল জ্ঞান-গরিমা ছাড়ায়া গেলে, সকল প্রজ্ঞা ফালায়া দিলে যে-অনর্থকতা সামনে আসে, সেইটাই পরম আনন্দের। নিজের লগে নিজের এই বোঝাপড়া হরদম চলতেছে আমার মধ্যে; তবু সুরাহা পাই না।



একটা পাখি, গরু, ছাগল কিংবা ধরি একটা সাপের কথাই, হ, বিষাক্ত সাপও মরণকালে মানুষের মহব্বত টাইনা নেয় কখনো কখনো। ডানপিটে বালকদের লাঠির আঘাতে আধমরা সাপরে দেইখা কোনো বুড়া লোক হয়তো কয়া উঠলো, আর মারিস না, দূরে ফালায়া দে। কিন্তু মাছের জন্য ভরাট দিলের কোনো মানুষকে এইভাবে আগায়া আসতে শুনি নাই। কাজেই স্বপের মধ্যে নির্বাক মাছের জীবদ্দশায় আমার নিজের হায়াত যে বদলায়া গেছিল, সেইটা নিয়া মনে মনে ডর পাইবার কারণতো আছেই। কিন্তু যে-কিয়ৎক্ষণ আমি একটা বড় শরপুঁটি বা কওয়া যায় একটা মাঝারি গোছের কার্ফু মাছের আকৃতি লইয়া হেইলাদুইলা পানিপথে খেলতেছিলাম নিজের লগে, ওই বেলাটায় কোনো বেদনা বা কষ্টবোধের সামান্য মিটমিটও টের পাই নাই। মনে হইছে সকল আক্কেল ডিঙায়া গেলে, সকল জ্ঞান-গরিমা ছাড়ায়া গেলে, সকল প্রজ্ঞা ফালায়া দিলে যে-অনর্থকতা সামনে আসে, সেইটাই পরম আনন্দের। নিজের লগে নিজের এই বোঝাপড়া হরদম চলতেছে আমার মধ্যে; তবু সুরাহা পাই না। মাছের স্বরূপে আমি যে-আনন্দ পাইছি, মানবজনমে সেই আনন্দরে হাতায়া দেখতে চাইছি। হালকা, নির্বিরোধ, চটপটে অথচ বাকরুদ্ধ মাছের কায়া ধারণে যে-সুখ স্বপ্নের মধ্যে অপার মহিমা ঢালছে একদিন, সেই পরম পানির জীবন কেউ আমারে দিবো না। তাই নিজেরেই নিজে একবার জিগাইছি: তবে সুখ কোন মহিষের নাম? কোন ঘাটে জল খায় বাঘের সহিত?



যুদ্ধবাজ দুনিয়ারে এখন বেরহম লাগতেছে। তাই নিজেরে জিগাই: জ্ঞানহীন, শিক্ষাহীন, প্রজ্ঞাহীন, যুক্তির শিকলছেঁড়া অবোধ আনন্দের দিকে তুই আমারে কবে নিবি রে মন? জ্ঞান আছে বইলাই ফিলিস্তিনের গণখুন চায়া চায়া দেখি, আফসোস বদলায়া যায় ইহুদিপ্রতিভার প্রশংসায়। ক্ষিদায় কাতর গাজাবাসী আর নাবালক পোলাপানের মওত দেখতে দেখতে সবুরের মেওয়া খুঁজতেছি প্রজ্ঞা দিয়া



না, জওয়াব মিলে নাই। মাছ যেমন কথা কইতে পারে না, আমিও তেমনি লা-জওয়াব হয়া ঘরের খিড়কি ধইরা খাড়ায়া থাকি। আসমানের ছাড়া ছাড়া মেঘগুলারে ভাবতে থাকি হাওয়াই মিঠাই। কিছু মেঘ দেখলে আচানক মনে হয় বড় কোনো গুঁইসাপ থুতুর দলা ছিটায়া রাখছে। জানালা হইলো ঘরের চোখ। সেই চোখে দুনিয়া দেখি। যতদূর চোখ যায়, ততদূর দুনিয়া আমার। চোখ যা ডিঙাইতে পারে না, তার পরের দুনিয়াটা হাতছানি দেয়। কিন্তু ধরা দেয় না। যেমন ধরা দেয় না জীবনের পরমার্থ। তাই নিজেরে নানান কিছিমের প্রশ্ন জিগাই, রূপরসগন্ধময় কত ছবি দেখতে দেখতে জীবনের তুলনা খুঁইজা পাই না। ন্যাংটা কালের আরেকটা মাছের স্বপ্নের মধ্যে ডুইবা যাইতে থাকি। তখন আমার বিছানায় পেশাব করার বয়স। একটু ডাঙর হইয়াও এই অপকর্মে অপার্থিব সুখ পাইছি আমি। আমাদের বাড়ির পূবে কিছুটা হাঁটলে হাজিবাড়ি। যতদূর ঠাওর করি, ওই বাড়ির দেওড়িমুখের একটু আগে একটা আমগাছ আছিলো। একদিন ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া দেখতেছি ওই গাছতলায় এক চিলতা ঘাসের ওপর পানি জমছে। রাইতে বৃষ্টি হইছে ঠাওর হইলো। সেইখানে দুইটা বড় কাতল মাছ লাফাইতেছে। সকালের নরম, ভেজা বাতাসে খাড়ায়া খাড়ায়া আমি একলাই দেখতেছি কাতল মাছের নাচ। মনে হইলো মাছ দুইটা আসমান থেইকা আল্লা’য় আমারে পাঠাইছে। তাই লাফায়া লাফায়া অমল আনন্দ দিতেছে আমারে। সেই অলৌকিক মুহূর্তরে দলা পাকাইয়া বুকের মধ্যে গুইঞ্জা রাখছিলাম। স্বপ্নে মাছ হয়া সেই শিশুতোষ আনন্দের রূপালি ঝলমল দেখতে পাইছি আবার। যুদ্ধবাজ দুনিয়ারে এখন বেরহম লাগতেছে। তাই নিজেরে জিগাই: জ্ঞানহীন, শিক্ষাহীন, প্রজ্ঞাহীন, যুক্তির শিকলছেঁড়া অবোধ আনন্দের দিকে তুই আমারে কবে নিবি রে মন? জ্ঞান আছে বইলাই ফিলিস্তিনের গণখুন চায়া চায়া দেখি, আফসোস বদলায়া যায় ইহুদিপ্রতিভার প্রশংসায়। ক্ষিদায় কাতর গাজাবাসী আর নাবালক পোলাপানের মওত দেখতে দেখতে সবুরের মেওয়া খুঁজতেছি প্রজ্ঞা দিয়া। আর শিক্ষা ও সভ্যতার হেডম আমগরে শিখাইছে শক্তিই আখেরে কামে লাগে। ইরানের ওপর বোমা মারছে, মারুক না। যে-ক্ষমতাবান, তার বেলায় হাত গুটায়া রাখাই যুক্তি। মুখ বুইজা থাকাই দেশের তাকদ। নিজের ক্বলবের মধ্যে অশান্তির হাওয়া যখন ঝাপটা মারে, নিজের কবিতা নিজেই আওড়াই:
যখন রাষ্ট্রই দু:খ, সমাজ বেদনাবহ ভুলের নির্যাস
তখন কারোর ব্যক্তিগত দু:খ নাই।
কথা হইলো ব্যক্তিগত সুখও তো তলায়া যাইতেছে। এআই কবজা করতেছে আমাদের কল্পনার রুহানি জগৎ। শান্তির স্বপক্ষে তাইলে আর যামু কই? যদি তাকদিরে কোনোদিন জান্নাত এলায়া পড়ে আমার দিকে, আমিও চায়া লমু মাছের রুহানিয়াত। জ্ঞানহীন, প্রজ্ঞাহীন, শিক্ষাসভ্যতার লাগামছাড়া অনন্ত ঘোরের লুটোপুটি লয়া যেন আমি মাছের কুমার, অলৌকিক খিজিরের পানির সহগ। কেবলি শান্তি চাই। শান্তি, শান্তি, শান্তি!

লেখক পরিচিতি

মানুষ ডেস্ক
মানুষ ডেস্ক
শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি মানুষের মনকে করে উদার ও কোমল। যে ব্যক্তি এগুলো হৃদয়ে লালন ও চর্চা করে সে কখনও সমাজবিদ্বেষী কাজ করতে পারে না। সাহিত্য বিভিন্ন যুগের ও বিভিন্ন গোত্রের সমাজ সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেয়। বিভিন্ন স্থানের ভাষা শিখতে সহায়তা করে। সাহিত্য মানব মনে প্রেম, বিরহ, সুখের অনুভূতি সৃষ্টি করে। অথচ শিক্ষার অভাবে আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মা-বাবা তাদের সন্তানদের শিল্প ও সাহিত্য পাঠে মন থেকে সম্মতি দেন না।
এ বিভাগের আরও লেখা

ফেসবুক পেইজ

বিজ্ঞাপন

spot_img

জনপ্রিয় লেখা

বুক পকেটে আমাদের সৌরভ