ইতিহাসের ১০ মিনিট
ভিটগেনস্টাইন কেন পপারকে মারতে উদ্যত হন?
সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার
১৯৪৬ সালের ২৫ অক্টোবর শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে আটটায় ক্যাম্ব্রিজের কিংস কলেজের ছোট্ট একটা রুমে সাপ্তাহিক এক বক্তৃতা ঘিরে একত্রিত হয়েছেন অধ্যাপক লুড ভিগভিটগেনস্টাইন, কার্ল পপার আর বাট্রান্ড রাসেল। সাথে আরও বেশ কিছু দর্শনের পণ্ডিত।বক্তৃতার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে পপারকে। উল্লেখ্য ১৮৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত মোরাল সায়েন্স ক্লাবের এই বক্তৃতার ইতিহাস অত্যন্ত দীর্ঘ এবং তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমা বিশ্বের খুবই প্রসিদ্ধ দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী এই ক্লাবে বক্তৃতা দিয়েছেন। ১ ঘন্টার সেই সব বক্তৃতা ঘিরে চলতো বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনা। গোটা বিশ্বের চিন্তাশীল মানুষের কাছে এই ক্লাবের অন্যরকম এক গুরুত্ব ছিল।
যাহোক সে সময় পপার লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স (LSE)-এ রিডার পদে সবে যোগ দিয়েছেন। তাঁর কিছু আগে তিনি নিউজিল্যান্ডের ক্যান্টারবারি ইউনিভার্সিটি কলেজে অধ্যাপনা শেষ করেছেন। পপার যেহেতু ইহুদি ছিলেন এ কারণে হিটলারের ভয়ে নিউজিল্যান্ড গিয়েছিলেন কিছু দিনের জন্য। যুদ্ধশেষে ইংল্যান্ডে ফিরে আসেন। ক্যান্টারবারি থেকে ফিরে আসার আরেকটা কারণ ছিল অতিরিক্ত চাপ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সাথে তাঁর বেশি একটা বনিবনা ছিল না। LSE-তে পপারের সাঙ্ঘাতিক এক বৈদ্ধিক আধিপত্য গড়ে উঠেছিল। ১৯৬৯ পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি এখানে ছিলেন। পরবর্তীতে ইমরেল্যাকাটস এবং জন ওয়াটকিন্স এখানে যোগদান করেন। অনেকেই নাকি পপারের প্রভাবের কারণে এটাকে‘পপারীয় দর্শন দুর্গ’নামে ডাকতো।
যাই হোক, ভিটগেনস্টাইনও বাট্রান্ড রাসেলের সাথে পপারের মিলিত হবার সেটাই ছিল একমাত্র এবং শেষ ঘটনা।এরপর কোনদিনই এই তিনজনকে এক সাথে দেখা যায়নি।যদিও ভিটগেনস্টাইন পপার দুজনেই একে অন্যের দর্শন সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিলেন তবু সরাসরি দেখা হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম এটাই শেষ। জানা যায় ভিটগেনস্টাইন ও পপারের মধ্যে খুব বেশি একটা সদ্ভাব ছিল না। দু’জনেই অষ্ট্রিয়াতে জন্ম নিয়ে ছিলেন বটে তবে তাঁদের সম্পর্কের তিক্ততার ইতিহাস বহু লম্বা। কিছুটা ব্যক্তিত্বের সংঘাত কিছুটা দার্শনিক মত পার্থক্য। আগের থেকেই পপারের মনের ভেতর একটা গোপন ইচ্ছে ছিল, বক্তৃতার সুযোগ নিয়ে ভিটগেনস্টাইনের কাঁধ উঁচু ভাবটা ঘুড়িয়ে দিবেন! দর্শনের প্রকৃতি বা বিষয়বস্তু নিয়ে তাঁদের মাঝে বিস্তর মত পার্থক্য যে এই পর্যায়ে পৌঁছাবে সেটাকে জানতো?
সে দিনের সন্ধ্যায় অনেকের মধ্যে ছিলেন রিচার্ড ব্রেথওয়েট, জি. ই. এম. অ্যান্সকম্ব, পিটার গীক এবং এ সিইউইং। রিচার্ড ব্রেথওয়েট ছিলেন ক্যাম্ব্রিজের খুবই নামকরা একজন বিজ্ঞানের দার্শনিক যিনি নীতিবিদ্যায় মানুষের নৈতিক সিদ্ধান্ত সংক্রান্ত‘ গেইমথিওরি’ প্রবর্তন করেন।অ্যান্সকম্ব ছিলেন ভিটগেনস্টাইনের ছাত্রী এবং ক্যাম্ব্রিজের মোরাল ক্লাবের অন্যতম এক সদস্য। অ্যান্সকম্ব একমাত্র প্রভাবশালী বৃটিশ মহিলা বিশ্লেষণী দার্শনিক যাকে শক্তিশালী ও তীক্ষ্ণধী নারী দার্শনিক বলে সবাই জানতো। পিটার গীক অ্যান্সকম্বের স্বামী এবং উদীয়মান একজন দার্শনিক। আর এ সিইউইং তো সবারই পরিচিত, সে সময় ক্যাম্ব্রিজের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন অধ্যাপক। সব মিলিয়ে সেই ছোট্ট ঘরে সে দিনের সন্ধ্যায় জনা ত্রিশের মতো অধ্যাপক-গবেষক উপস্থিত। মোরাল সায়েন্স ক্লাবের আমন্ত্রণে সবাই এসেছেন গিবস বিল্ডিঙের সিঁড়ির কোনায় H3 রুমে। ক্লাবের সে সময়ের সভাপতি ভিটগেনস্টাইন নিজেই। রুমটা মূলত ব্যবহার করেন রিচার্ড ব্রেথওয়েট। অন্যান্য রুমের মতো H3 পরিপাটি নয়। কিছু টানোংরা, আশেপাশে আবর্জনা, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ময়লা। পাশে জলন্ত ফায়ার প্লেস এবং আছে একটা উত্তপ্ত লোহার শিক যেটাকে বলা হয় পকার। এই শিক দিয়েই ফায়ার প্লেসের আগুন মাঝে মাঝে খুঁচিয়ে দিতে হয়।মজার ব্যাপার এই লোহার শিকটাই ছিল সে দিনের সবচেয়ে আলোচিত বস্তু। পরবর্তীতে এই শিক নিয়ে ডেভিড এডমন্ড এবং জন ইডিনাউ‘ ভিটগেনস্টাই ন্সপকার’নামে দারুণ একটা ফিলসফিক্যাল ডিটেক্টিভ লিখেছেন। ভিটগেনস্টাইন ও পপারের সেই অস্বস্তিকর উত্তেজনার স্থায়িত্ব ছিল ১০ মিনিট। ঐতিহাসিক সেই ১০ মিনিটের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং সাংঘাতিক এক অপ্রীতিকর অবস্থা নিয়ে বইটা কালের সাক্ষী হয়ে আছে।
“তুমি মনে যে তুমি তোমার পূর্বপুরুষ থেকে বেশি চালাক, তাই তো? ( So you think you are cleverer than your ancestors, do you?)। কান্তি শাহ পরবর্তীতে কর্ণাটক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। কান্তি শাহ দীর্ঘদিন ভিটগেনস্টাইনের সাথে চলাফেরা করে বুঝতে পারেন, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি খুব সহজেই উত্তেজিত হয়ে পড়তেন, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বদমেজাজি এবং অসহিস্নু। আমাদের আলোচনার কুখ্যাত ১০ মিনিটসেই ঘটনাকেই মনে করায়।
পপার,লন্ডন থেকে এসেছেন কেম্ব্রিজে। এক সময় কম্যুনিস্ট হিসেবে নিজেকে দেখতে চেয়েছিলেন কিন্তু কালের পরিক্রমায় তিনি ছেড়ে এসেছেন সে পথ। LSE-তে পড়াচ্ছেন লজিক এবং সায়েন্টিফিক মেথড। পপারের বৈদ্ধিক উচ্চতা ছিল ঈর্ষণীয়। যৌক্তিক প্রত্যক্ষ বাদের জয়জয়াকারের মাঝে তিনি ছিলেন উল্টো স্রোতের মানুষ। কারণ তিনি তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে এক বৈপ্লবিক তত্ত্বের অবতারণা করেন যেটাকে ক্রিটিক্যাল রেশনালিজম নামে অভিহত করা হয়। ত্রিশ চল্লিশের দশকে বড় বড় বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকরা কোনো তত্ত্বকে ‘সত্য প্রমাণ’করার পেছনে ছুটছিলেন, কিন্তু পপার তখন দাবি করেন যে—বিজ্ঞানের কাজ সত্য প্রমাণ করা নয়, বরং ভুল প্রমাণ করা। বিজ্ঞান আমাদের কোন জ্ঞান দিতে পারে না, শুধু দেয় সম্ভাবনা যা পরবর্তীতে ভুল প্রমাণিত হবেই। কাজেই বিজ্ঞান অভ্রান্ত কিছু নয়। আমরা যা পাই তা অনুমান বা কঞ্জেকচার মাত্র! অর্থাৎ বিজ্ঞান নিয়ে পপার মারাত্মকভাবে ছিলেন ক্রিটিক্যাল। পপারের এই অবস্থান বলতে গেলে তখন সবাইর জানা। কারণ ১৯৩৪ সালে তিনি তাঁর প্রধানগ্রন্থ ‘দ্যা লজিক অব সায়েন্টিফিক ডিস্কভারি’ লিখেছেন জার্মান ভাষায়। এখানে তিনি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন কোন বৈজ্ঞানিক সত্য যে আরোহ পদ্ধতির হাত ধরে গড়ে ওঠে তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। এরও পরনির্ভর করা যুক্তিযুক্ত হবেনা কারণ অনন্ত সংখ্যক দৃষ্টান্ত কোন দিন কারো পক্ষে পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। পপার তাই অনেকটা হিউমের মতো প্রকৃতির ঐক্য, সর্বজনীন নিয়ম ইত্যাদি গ্রহণ করেননি। তাঁরা দুজনেই তথাকথিত আরোহ অনুমিতি ছুঁড়ে ফেলেছেন যার ওপরভিত্তি করে গড়ে ওঠে বিজ্ঞানের অব্যর্থ সবতত্ত্ব।
সে দিনের সেই বক্তব্যের শিরোনাম ছিল, ‘দার্শনিক সমস্যা বলে কি কিছু আছে?’ (Are There Philosophical Problems?। পপার দার্শনিক সমস্যা বলতে মানুষের জীবন, জগৎ, জ্ঞান, অস্তিত্ব এবং নৈতিকতার এমন কিছু মৌলিক, গভীর এবং চিরন্তন প্রশ্নকে বুঝিয়েছেন, যা কেবল গবেষণাগারের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা গণিতের হিসাব দিয়ে সমাধান করা যায় না। এগুলো মূলত চিন্তা, যুক্তি এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ভিটগেনস্টাইন এটা মানতে রাজি নন। সরাসরি তিনি বলতে চান, দার্শনিক সমস্যা মানেই ভাষার কিছু কুটচাল সমাধান করা। কারণ আমাদের মূল কাজ হচ্ছে ভাষার অস্পস্টতা দূর করে সেটাকে বোধগম্য করে তোলা। তিনি আরও বলেন, এগুলো আসলে কোনো প্রকৃত সমস্যাই নয়, বরং এগুলো হলো ‘ভাষার অপব্যবহারজনিত বিভ্রান্তি’ বা এক ধরণের মানসিক রোগ। তিনি তাঁর ‘ফিলসফিক্যাল ইনভেস্টিগেশনস’-এ একটা মারাত্মক বিতর্কের অবতারণা করে বলেছেন, একজন দার্শনিক কোনো প্রশ্নকে সেভাবেই দেখেন, যেভাবে একজন চিকিৎসক কোনো রোগকে দেখেন” (The philosopher treats a question; like an illness)। তিনি আরও বলেন, আমরা জগতের যে সব সমস্যাবলি এবং যে গুলো নিয়ে আমরা প্রায়শই বিভ্রান্তিতে পড়ি যেমন ‘ সত্য কী?’, ‘জ্ঞানের উৎস কী?’, ‘দেহমনের সম্পর্ক কী?, ‘সুন্দর কী”, মঙ্গল কাকে বলে? ইত্যাদি –এই বিষয়গুলো জগতের কোন প্রকৃত সমস্যা নয়। এগুলো সমস্যা হিসেবে মনে করার কারণ ভাষার স্বাভাবিক ব্যবহারের বদলে এগুলোকে আমরা অহেতুক টেনে হিঁচড়ে চিন্তায় ধ্বস্তাধস্তি করি। ভিটগেনস্টাইন গভীরভাবে বিশ্বাস করেন ভাষা আমাদের বুদ্ধিকে অনেক সময় বিকল করে দেয় যার ফলে আমরা এক ধরনের গোলক ধাঁধায় পড়ে যাই। এখান থেকে উত্তরণের জন্য ভাষাকে যৌক্তিক কাঠামোর মধ্যে ফেলে বিশ্লেষণ করলেই জগত আমাদের কাছে স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।
পপারের বক্তব্যের চলার মধ্যেই শুরু হয় ঝামেলা। ভিটগেনস্টাইন হঠাৎ তেড়ে যান পপারের দিকে। মুহূর্তেই H3 রুম অস্বস্তিকর উত্তেজনায় ভরে যায়। সত্যিকার অর্থে সে দিনের সেই উত্তজেনার ১০ মিনিট শুধুমাত্র দুজন পাশ্চাত্য দার্শনিকের মুখোমুখি গণ্ডগোলই নয় বরং দর্শন ইতিহাসের অতি অমীমাংসিত এক প্রশ্নের‘জয় পরাজয়ের’ গল্প। আজকের নিবন্ধ সেই গণ্ডগোলের সূত্র ধরে কিছু প্রশ্নের সমাধান। পপারের সেই বক্তব্যের পৌনে একশ বছর পরেও আমাদেরকে দারুণ কৌতূহলী করে। কী ঘটেছিল সে দিন, কেনই বা ঘটে ছিল! সাথে সাথে আমরা দেখবো, পপারের সেই বক্তব্যের মূল কথা কী? আদৌ কি এই বক্তব্য সমালোচনা করা চলে? উল্লেখ করি, পপারের সে দিনের সেই বক্তব্য‘দ্যা নেচার অব ফিলসফিক্যাল প্রব্লেমস এন্ড দেয়ার রুটস ইন সায়েন্স’ শিরোনামে একটা অধ্যায় তাঁর‘কঞ্জেকচার এন্ড রিফিউটেশন্স’ বইয়ে পরবর্তীকালে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অনুমান করা যায়, সে দিনের সেই পঠিত বক্তব্যের থেকে এটা অনেকটা পরিবর্ধিত এবং পরিবর্তিত। ভিটগেনস্টাইনের মৃত্যুর পর সেটা কঞ্জেকচার এন্ ডরিফিউটেশনস-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দুর্ভাগ্য ভিটগেনস্টাইনের তাঁর অকাল মৃত্যুর ফলে(১৯৫১) তিনি পপারের উক্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি।
ভিটগেনস্টাইন ছিলেন সেরাদের সেরা। এরোনেটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার থেকে হয়েছেন দার্শনিক। ক্যাম্ব্রিজে রাসেলের ছাত্র। রাসেল তাঁর সমগ্র জীবনে সম্ভবত এতো মেধাবী ছাত্র পাননি। ছাত্র হিসেবেই শুধু নয় বন্ধু হিসেবেও ভিটগেনস্টাইন ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। রাসেলের জীবনে ভিটগেনস্টাইনের প্রভাব এতোটাই বেশি ছিল যে, তিনি তাঁর অনেক চিন্তাধারা বাদ দিয়েছেন ভিটগেনস্টাইনের সমালোচনার প্রেক্ষিতে।থিওরি অব নলেজ সংক্রান্ত রাসেলের একটা ধারণাকে ভিটগেনস্টাইন এতোটাই সমালোচনা করে বসেন যা এক সময় রাসেলের তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে ওঠে। কয়েকশ পৃষ্ঠার ম্যানস্ক্রিপ্ট রাসেল ফেলে দেন প্রকাশ না করে শুধু ভিটগেনস্টাইনের সমালোচনার প্রেক্ষিতে। জি ই ম্যুরও ভিটগেনস্টাইন সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত ধারণা পোষণ করতেন। রাসেল এক দিন ম্যুরকে বলছেন, ছেলেটা অতি মেধাবী আর সত্যিকারের জিনিয়াস। ম্যুর সাঁই দিলেন। রাসেল বললেন, তোমার কেন মনে হয়েছে, সে জিনিয়াস? ম্যুর উত্তর দেন, আমি এক দিন একটা বক্তৃতা দিচ্ছিলাম সে অত্যন্ত বিচলিত হয়ে ভ্যাবলার মতন আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, অন্য আর কারো মুখে সেই অভিব্যক্তি দেখিনি! ভিটগেনস্টাইনের মেধা ছিল সাঙ্ঘাতিক চোখা। সংখ্যার দিক থেকে খুব কম সংখ্যক বই লিখলেও দর্শনের ইতিহাসে সত্যিকারের বৈপ্লবিক ধারা তিনি শুরু করেছেন। মরিজশ্লিক বলছেন হাজার বছরের দর্শনের ইতিহাসের একটা মোড় ঘুরিয়েছেন ভিটগেনস্টাইন যেটাকে তাঁর কথায়‘ টার্নিং পয়েন্ট ইন ফিলোসফি’। রাসেল-ভিটগেনস্টাইনের বন্ধুত্ব ছিল বিশ্ব দর্শন ইতিহাসের মূল্যবান এক অধ্যায়। ভিটগেনস্টাইন ইহুদি হলেও হিটলারের হাত থেকে বেঁচে গেছেন। কথিত আছে ভিটগেনস্টাইন লোক মারফৎ হিটলারকে বিপুল টাকা দিয়ে অনিষ্ঠের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। ভিটগেনস্টাইনের পরিবার ছিল অতি ধনাঢ্য আর ঐতিহাসিকভাবে জমিদার। অস্ট্রো-হাংগেরিয়ান সাম্রাজ্যের খুবই নামকরা এক পরিবার যাদের আদি ব্যবসা ছিল স্টিলের। ১৮৮০-৯০ এর দশকে এই পরিবার ছিল গোটা ইউরোপের মধ্যে ধনী পরিবার। ধনী হিসেবে রথ চাইল্ড পরিবারের সমকক্ষ। কিন্তু ভিটগেনস্টাইন এসব ঐশ্বর্য ছেড়ে চলে এসেছিলেন অতি কৃচ্ছ জীবনে। কাজ করেছেন সাধারণ মানুষের মতো হাসপাতালে, স্কুলে এ সব জায়গায়। ভিটগেনস্টাইনের পরিবারে ছিল আত্মহননের এক ভয়ানক ট্রেন্ড। তাঁর তিনটা বড় ভাই আত্মহত্যা করেন তীব্র মানসিক যন্ত্রণায়।তাঁর বাবা কার্ল একজন অত্যাচারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ধারণা করা হয় বাবার আকাশ সমান প্রত্যাশা ছিল ছেলেদের নিয়ে। মানসিক অবসাদ এবং হাইপারটেনশান থেকে তাঁরা প্রত্যেকেই এই পথ বেছে নেন বলে জানা যায়। ভিটগেনস্টাইনের মাঝেও এই প্রবণতা কম বেশি ছিল যেটা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। তবে তাঁর যে একটা খ্যাপাটে মেজাজ ছিল সেটা ভালোভাবে জানতেন রাসেল কারণ রাসেলের সংস্পর্শে তিনি বহুকাল কাটিয়েছেন ক্যাম্ব্রিজে। কান্তি শাহ নামে ভিটগেনস্টাইনের একজন ভারতীয় ছাত্র সে সময় কেম্ব্রিজে তাঁর নোট নিতেন। ১৯৪৬ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৪৭ সালের মে পর্যন্ত কান্তি শাহ ভিটগেনস্টাইনের নোট লেখেন। কান্তি শাহ ব্যক্তিগতভাবে ভিটগেনস্টাইনের ছিলেন খুবই কাছের। তিনি এক স্মৃতিচারণে জানাচ্ছেন, অতিদূর পর্যন্ত তাকে নিয়ে ভিটগেনস্টাইন হাঁটতেন। এক দিন কান্তি শাহকে জিজ্ঞেস করছেন, তুমি হিন্দু না মুসলিম? কান্তি উত্তর দেন, আমি জৈন। তুমি কি জানো যে জৈনধর্মে আছে, সবচেয়ে মহৎ মানুষগুলো মৃত্যুর পর একটা পাহাড়ের চুড়ায় বসে ধ্যান করবে? কান্তি উত্তর দিয়েছিলেন, এসব বাজে কথায় কে বিশ্বাস করে? ভিটগেনস্টাইন তাৎক্ষণিক বলেন, “তুমি মনে যে তুমি তোমার পূর্বপুরুষ থেকে বেশি চালাক, তাই তো? ( So you think you are cleverer than your ancestors, do you?)। কান্তি শাহ পরবর্তীতে কর্ণাটক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। কান্তি শাহ দীর্ঘদিন ভিটগেনস্টাইনের সাথে চলাফেরা করে বুঝতে পারেন, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি খুব সহজেই উত্তেজিত হয়ে পড়তেন, স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বদমেজাজি এবং অসহিস্নু। আমাদের আলোচনার কুখ্যাত ১০ মিনিটসেই ঘটনাকেই মনে করায়।
ঘটনার বর্ণনা
১৯৪৬ সালের কোন এক সময় পপার ক্যাম্ব্রিজ থেকে একটা আমন্ত্রণপত্র পান। আমন্ত্রণপত্র আসে কেম্ব্রিজের মোরাল সাইন্স ক্লাবের সেক্রেটারির কাছ থেকে। বিষয়বস্তু আগেই জানিয়ে দেওয়া হয় কিছু দার্শনিক ধাঁধার ওপর কথা বলতে হবে। এই বিষয়টা ঠিক করে দেন ভিটগেনস্টাইন নিজেই। ভিটগেনস্টাইনের এটা ঠিক করে দেওয়ার পেছনে একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গী ছিল যে, দর্শন আর কিছুই না শুধুমাত্র কিছু ধাঁধার সমাধানমাত্র। আদতে দার্শনিক সমস্যা বলতে আদৌ কোন সমস্যা নেই। এ বিষয়ে পপারের তীব্র অনীহা ছিল, তাই তিনি আগের থেকে ঠিক করেছেন বলবেন দর্শনের আদৌ কোন সমস্যা আছে কি নেই এই নিয়ে। কিন্তু আলোচনা শুরুর পরপরই দেখা গেলো ভিটগেনস্টাইন লাফ দিয়ে উঠে চিৎকার করে পপার কে বলে উঠলো, “সেক্রেটারি যে বিষয়টা বলতে বলছে সে বিষয়টাই বলতে হবে”। ভিটগেনস্টাইনের কিছু ভক্ত অনুসারী সেটা লক্ষ করে তারাও আপত্তি জানাতে থাকলো।কিন্তু পপার তাঁর লিখিত বক্তব্য না থেমে বলতে থাকেন। এর প্রেক্ষিতে ভিটগেনস্টাইন একটা গরম লোহার রড নিয়ে পাপারের দিকে তেড়ে গেলেন। রাসেল তখন উচ্চ স্বরে ভিটগেনস্টাইনকে বললেন, “ভিটগেনস্টাইন তুমি ঝামেলা করছ, এবং এই কাজ তুমি সব সময়ই করে থাকো”। এমন অবস্থায় পপার বললেন, যদি দর্শনে কোন সমস্যা নাই থাকে তা হলে আমিও নিশ্চিতভাবে এক জন দার্শনিকনই। ভিটগেনস্টাইন এতে করে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে মারতে উদ্যত হলেন এবং চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন, দার্শনিক সমস্যা বলে কোন সমস্যা নেই;যা আছে সব ধাঁধাঁ আর ভাষার গণ্ডগোল। অবস্থা বেগতিক দেখে রাসেল চরমভাবে রেগে গিয়ে বললেন, ভিটগেনস্টাইন আমি বলছি তুমি রডটা এখুনি হাত থেকে ফেলে দাও। পপারও তখন উত্তেজিত হয়ে গিয়ে বলা শুরু করলেন, দর্শনে যে সব সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় সেগুলো তাহলে কী? দর্শন শুরুই হয়েছে জাগতিক সমস্যা নিয়ে গভীর আলোচনার মধ্য দিয়ে। আমরা জ্ঞান নিয়ে যে আলোচনা করি তা কি দর্শনের সমস্যা নয়? আমরা যা জানছি সেসব কতটুকু নির্ভুল, কতটুকু নির্ভরযোগ্য সেগুলো নিয়ে গভীর আলোচনা কি দর্শনের আলোচনা নয়? আমরা আমাদের ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা থেকে যে সব বিষয় আরোহমূলক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি সেগুলো কি সমস্যা নয়? আমরা কি আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বস্তুকে জানতে পারি? সন্দেহাতীতভাবে বলা যায়, ভিটগেনস্টাইন একজন ধার্মিক ছিলেন যার ফলে তিনি মুখে যাই বলুন তাঁর অন্তরের গভীরে শরীর, আত্মা -এসব নিয়ে অন্যরকম এক বোধ ছিল বৈকি! (Norman Malcolm, Wittgenstein: A Religious Point Of View?)কাজেই শরীর আত্মা নিয়ে যে কোন দার্শনিক সমস্যা থাকবে না এটা হতেই পারে না।
১০ মিনিটে ঠিক কে জিতেছে সে বিষয়ে বলা মুশকিল তবে পপার নিজেকে এককভাবে বিজয়ী ঘোষণা করেছিলেন। পপার তাঁর আত্মজীবনী আনএন্ডেডকোয়েস্ট-এ লিখেছেন, “ভিটগেনস্টাইন বেশ নার্ভাসভাবে ফায়ারপ্লেসের পোকারটি (লোহার শিক) নিয়ে খেলছিলেন” এবং তিনি তাঁর নিজের যুক্তিগুলোকে জোরদার করতে অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টরের লাঠির মতো করে সেটি বাতাসে দোলাচ্ছিলেন” । পপার ভিটগেনস্টাইনের সেদিন পাত্তা না দিয়ে একের পর এক যুক্তি দিচ্ছিলেন এবং এতে করে ভিটগেনস্টাইন যে ক্ষিপ্ত হয়ে চরমভাবে মেজাজ হারিয়েছেন সেটা বোধ করি সহজেই বুঝা যায়।
- ভিটগেনস্টাইন বলে উঠলেন এসবগুলোই লজিক্যাল সমস্যা একটাও দার্শনিক সমস্যা নয়। ভিটগেনস্টাইন মুহূর্তে তাঁর হাতের গরম লোহার রডটা নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে নাকের কাছে এসে এমন বিশ্রিভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে থাকলেন। মুহূর্তেই রীতিমত সেটা ভীতিকর এক অবস্থা তৈরি হল। কিছু উপায় না পেয়ে ভিটগেনস্টাইন বললেন, “যদি পারো তাহলে একটা নৈতিক নিয়মের উদাহারণ দিয়ে দেখাও তো? পপার বলে উঠলো, “একজন আমন্ত্রিত অতিথির ওপর গরম লোহার রড নিয়ে তেড়ে না আসা”।ভিটগেনস্টাইন উন্মাদের মতন তখন ক্ষেপে গিয়ে রডটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দরজায় বাড়ি মেরে বেরিয়ে গেলেন।সেই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী। ঘটনাটা গোটা বিশ্বে দর্শনমোদীদের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। পপার নিজেই স্বীকার করেছেন, ঐ ঘটনার অল্প কয়েকদিন পরেই নিউজিল্যান্ড থেকে আমি একটা চিঠি পেলাম যাতে লেখা ছিল তুমি নাকি ভিটগেনস্টাইনের সাথে গরম লোহার রড নিয়ে হাতাহাতিকরেছ?
পপারের বক্তব্য
পপার মনে করেন দর্শনে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট সমস্যা আছে। অর্থাৎ জগতের মৌলিক সমস্যা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করাই দর্শনের কাজ এবং অবশ্যই সেটা কঠিন যুক্তির কাঠগড়ায় নিয়ে। পপার জোর দিয়ে বলেন, এসব সমস্যার আদি উৎস বিজ্ঞান। তবে বিজ্ঞান ছাড়াও গণিত, মহাজাগতিক চিন্তা এবং রাজনীতির মতো বাস্তব ক্ষেত্রের সংকটের মধ্যে এসব সমস্যার শেকড়নিহিত। দর্শনের সমস্যা শুধু ভাষার ম্যারপ্যাচ নয়, বরং জগতকে বুঝার ক্ষেত্রে সৃষ্টি হওয়া প্রকৃত সমস্যা। মানুষের সাথে এবং জগতের সাথে যেসব বিষয়জড়িত তার উৎস খোঁজ করা দর্শনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
পপার মনে করেন, কোন প্রকৃত দার্শনিক সমস্যা আপনাআপনি সৃষ্টি হয় না। এগুলো হয় দর্শনের বাইরের থেকে। যেমন হতে পারে বিজ্ঞান, গাণিতিক বিষয়, রাজনৈতিক ব্যাপার, কিম্বা ইতিহাসের বিষয়বস্তু। প্রাচীন গ্রিসে যখন পরমাণুর ধারণা ডেমোক্রিটাস আবিষ্কার করেন তখন জ্যামিতিক বিন্দুর মতো বিমূর্ত ধারণার সৃষ্টি হয়। তখন একটা প্রশ্ন সামনে আসে, ক্রমপরিবর্তনশীল জগতে স্থায়ী জ্ঞান কীভাবে হবে? এ ধরনের গাণিতিক সংকট থেকে প্লেটোর থিওরি অব আইডিয়ার ধারণা তৈরি হয় বলে পপার মনে করেন। এর কারণ হল,প্লেটো বিশ্বাস করেন পরিবর্তিত ও খন্ডিত মহাবিশ্বে অপরিবর্তিত এবং শাশ্বত একটা সার্বিক ধারণা রয়েছে। যেমন গোটা দুনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি ধ্বংসও হয়ে যায় তবু বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার য়ে যাবে। এটা অনেকটা ভারতীয় চিন্তায় আত্মার মতো ব্যাপার। আবার যখন নিউটন তাঁর মহাকর্ষীয় তত্ত্ব আবিষ্কার করেন তখন একটা প্রশ্ন সামনে এসে হাজির হয়,মানুষ অভিজ্ঞতা ছাড়াই কীভাবে পরম ধারণা যেমন স্থান, কাল, কার্যকারণ এগুলো জানতে পারবে? এই মৌলিক প্রশ্ন থেকে কান্ট তাঁর ‘ক্রিটিক অব পিওররিজন’-এ দেখান আমাদের মন এই বাহ্য জগতের অভিজ্ঞতাকে সাজিয়ে দেয়। কান্ট বাইরের ঘরের দিকে নিজের ঘরের গুরুত্বটাকে বেশি দেন। এটাই অনেকটা কপারনিকান বিপ্লবের মতো যুগান্তকারী ধারণা। আবার ধরুন রাসেলের যৌক্তিক পরমাণুবাদ কিন্তু আকাশ থেকে পড়েনি। রাসেলের সেটা থিওরির কিছু লজিক্যাল প্যারাডক্স থেকে যৌক্তিক পরমাণুবাদ সৃষ্টি হয়েছে। রাজনীতিতেও দেখা গেছে অনেক সমস্যা থেকে দার্শনিক ভাবনার উদ্ভব হয়েছে। যেমন বিশশতকে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান, হিটলারের নাৎসি বাহিনী এবং স্টালিনের কমিউনিস্ট এক নায়কতন্ত্রের ফলে চরম রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট তৈরি হয়েছিল। এটা থেকে নিস্ক্রিতির উপায় হিসেবে পপার লেখেন ‘ওপেন সোসাইটি এন্ড ইটস এ নিমিজ’।প্লেটোর থিওরি অব জাস্টিস কিন্তু গ্রীসের চমর নৈরাজ্যের প্রেক্ষিতে সেখান থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে প্লেটোর মস্তিষ্ক থেকে পাওয়া একটা সমাধানের পথ। ঠিক এমনভাবেই তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা। পপারের ধারণা, এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে দর্শনকে যদি বিজ্ঞান, গণিত বা রাজনীতি থেকে আলাদা করে ফেলা হয়, তবে তা কেবলই অর্থহীন শব্দার্থের খেলায় পরিণত হয়।
দার্শনিক সমস্যা যে বিজ্ঞান থেকে আসা অতিগুঢ় একটা সমস্যা অথবা বিজ্ঞানের মধ্যেই যে দর্শনগত সমস্যা লুকিয়ে থাকে তার বড় উদাহারণ হচ্ছে আরহগত সমস্যা যা নিয়ে পপার সারা জীবন লড়াই করেছেন। যেমন ধরুন, ‘সব কাক কাল’’-এটা একটা সার্বিক প্রত্যয় যা অনেকগুলো কাক পর্যবেক্ষণ করার পর গৃহীত সিদ্ধান্ত। কিন্তু এর তো কোন শেষ নেই। যত কাকই পর্যবেক্ষণ করা হোক না কেন কিছুতেই তা শেষ হয় না। তাই হিউমের মতো পপারও মনে করেন আমরা সার্বিক যে সিদ্ধান্তই নিই না কেন তা কোন অবধারিত সিদ্ধান্তের ফলাফল হতে পারে না। তাই পপার মনে করেন, বিজ্ঞানের পদ্ধতি হবে অবরোহ এবং এই অবরোহ সিদ্ধান্তকে সামনে রেখে বৈজ্ঞানি করা খুঁজতে থাকবেন এর বিপরীত দৃষ্টান্ত। এটাই তাঁর মিথ্যায়ন নীতি। যাহোক এটা সত্য যে আরোহমূলক সমস্যা যদিও দার্শনিক সমস্যা কিন্তু এর শেকড় বিজ্ঞানের জ্ঞান নিশ্চিত কিনা তা জানার ওপর। তিনি মনে করেন বিজ্ঞানের অগ্রগতি হয় অনুমান এবং খণ্ডন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এবং এই প্রক্রিয়াটা অন্তহীন যেখানে কোন তত্ত্ যত বেশি কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় ততই এই তত্ত্ব শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মনে রাখার বিষয় বিজ্ঞানের কোন তত্ত্বই চূড়ান্তভাবে সত্য প্রমাণিত হয় না। পপার জোর দিয়ে বলেন, কোন বিষয় ঠিক বৈজ্ঞানিক না হলেই তা অর্থহীন হয় না। অনেক সময় কল্পকথা, রহস্যবাদ, এমন কি দর্শন বিজ্ঞান না হওয়ার পরেও অর্থহীন নয়। পপারের উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞান ও অবিজ্ঞানের মধ্যে একটা সীমানা টানা যার জন্য তিনি মিথ্যা প্রতিপাদননীতির প্রস্তাব করেন।
ভিটগেনস্টাইনের অবস্থান
ভিটগেনস্টাইনের মূল আলোচনা ভাষাকেন্দ্রিক। আমরা যা বলতে পারি আর পারি না তার একটা সুস্পষ্ট সীমানা টানা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। তিনি বলেন যদি ভাষার যৌক্তিক কাঠামো এবং সমাজে এর ব্যবহার বুঝতে পারি, তবেই সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তিক জটিলতার অবসান ঘটবে। হেগেল পরবর্তী দর্শনে একটা বিশেষ ধারা দেখতে পাওয়া যায় সেটা হচ্ছে বিজ্ঞান এবং দর্শনের মধ্যে নিরাময়হীন দূরত্ব। দার্শনিকদের অভিযুক্ত করা হয় যে তারা কোন ঘটনা ব্যাতিরেকেই সব কিছুর দর্শনিকায়ন করে থাকেন। কাজেই দর্শন মানে হয়ে গেছে এক ধরনের হাস্যরসের তুবড়ি।
ভিটগেনস্টাইনের কেন মনে হয়েছে যে দার্শনিক সমস্যা বলতে কিছু নেই সে সম্পর্কে পপারের ধারণার দিকে দৃষ্টি দিলেই বুঝা সম্ভব। ভিটগেনস্টাইন অনুপ্রাণিত হয়েছেন রাসেলের বর্ণনাতত্ত্ব এবং টাইপতত্ত্ব দিয়ে। রাসেল কোন ব্যাক্যের অর্থহীনতা এবং মিথ্যাত্ব আলাদা করেছেন তাঁর বর্ণনাতত্ত্বে। রাসেল মনে করেন একটি বাক্য ব্যাকরণগত ও যৌক্তিকভাবে সঠিক হওয়া সত্ত্বেও তা মিথ্যা হতে পারে যদি বাস্তব জগতে তার বর্ণনার কোনো অস্তিত্ব না থাকে। যেমন ‘ফ্রান্সের বর্তমান রাজা হন টাকমাথা’। আপাতত মনে হতে পারে বাক্যটি অর্থহীন বা এর কোনো সত্যমূল্য নেই, কারণ বর্তমানে ফ্রান্সে কোনো রাজা নেই। কিন্তু রাসেল দেখান যে বাক্যটি আদতে অর্থহীন নয়, বরং এটি একটি মিথ্যা বাক্য। অন্যদিকে, একটি বাক্য তখনই অর্থহীন বা তাৎপর্যহীন হয় যখন তার উপাদানগুলো যৌক্তিক নিয়ম বা ব্যাকরণ লঙ্ঘন করে অথবা এমন কোনো নাম ব্যবহার করে যার কোনো অস্তিত্ব বা অর্থ নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়। রাসেল এখানে সাধারণ নাম এবং বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য করেন। যেমন কেউ দাবি করলো, “উনবিংশ লুই টাকমাথা”। কিন্তু উনবিংশ লুইনামটি কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনা নয়, বরং একটি কাল্পনিক নাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। রাসেলের যুক্তি অনুযায়ী, একটি প্রকৃত নাম তখনই অর্থপূর্ণ হয় যখন বাস্তব জগতে তার দ্বারা নির্দেশিত কোনো বস্তু বা ব্যক্তি থাকে।তাঁর‘বর্ণনাতত্ত্ব’ (Theory of Descriptions) দিয়ে মূলত ভাষা থেকে অস্তিত্বহীন বা কাল্পনিক সত্তা এবং অলীক শব্দ বা নামকে বাস্তব বলে মনে করার বিভ্রান্তিবাদ দিতে চেয়েছেন। রাসেল বর্ণনা তত্ত্বের সমসাময়িক সময়ে টাইপ থিওরি আবিষ্কার করেন। এ দুটোতত্ত্বই দিয়ে মূলত ভাষা থেকে অস্তিত্বহীন বা কাল্পনিক সত্তা এবং অলীক শব্দ বা নামকে বাস্তব বলে মনে করার বিভ্রান্তিবাদ দিতে চেয়েছেন। বর্ণনাতত্ত্ব ভাষা থেকে অস্তিত্বহীন কাল্পনিক সত্তার বিভ্রান্তি দূর করে, আর টাইপ থিওরি দূর করতে চেয়েছেন যৌক্তিক আত্ম-বিরোধ বা প্যারাডক্স। ভিটগেনস্টাইন দর্শনের সমস্যা বলতে শুধুমাত্র ভাষার ধাঁধাকে বুঝিয়ে থাকেন। তাঁর আলোচনা মুখ্যত একটা থেরাপির সাথে তুলনা করা হয় যার মধ্য দিয়ে মানুষ অর্থহীন ও অর্থপূর্ণ বিষয় আলাদা করতে পারে। এটা এক ধরনের চিকিৎসা।
কে জিতলো?
ভিটগেনস্টাইন পপারের শ্বাসরুদ্ধকর ১০ মিনিটে ঠিক কে জিতেছে সে বিষয়ে বলা মুশকিল তবে পপার নিজেকে এককভাবে বিজয়ী ঘোষণা করেছিলেন। পপার তাঁর আত্মজীবনী আনএন্ডেডকোয়েস্ট-এ লিখেছেন, “ভিটগেনস্টাইন বেশ নার্ভাসভাবে ফায়ারপ্লেসের পোকারটি (লোহার শিক) নিয়ে খেলছিলেন” এবং তিনি তাঁর নিজের যুক্তিগুলোকে জোরদার করতে অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টরের লাঠির মতো করে সেটি বাতাসে দোলাচ্ছিলেন” । পপার ভিটগেনস্টাইনের সেদিন পাত্তা না দিয়ে একের পর এক যুক্তি দিচ্ছিলেন এবং এতে করে ভিটগেনস্টাইন যে ক্ষিপ্ত হয়ে চরমভাবে মেজাজ হারিয়েছেন সেটা বোধ করি সহজেই বুঝা যায়। অবশ্য সে দিনের ঘটনা সম্পর্কে ভিটগেনস্টাইনের অনুসারীরা লন্ডনের Times Literary Supplement পত্রিকায় চিঠি দিয়ে প্রতিবাদ করেন এবং লেখেন পপার সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলেছেন! তাঁরা জানান ভিটগেনস্টাইন চলে যাবার পর ফাঁকা রুমে রাসেলের সামনে একতরফা বলে গেছেন। সে ঘটনা সম্পর্কে ভিটগেনস্টাইন তাঁর বন্ধু ব্ল্যাকস্টোন ব্রেথওয়েট-কে লিখেছিলেন, পপার অত্যন্ত অগভীর ও আবর্জনাপূর্ণ একজনবক্তা। তিনি আরও লেখেন, পপারের মতো একজন সস্তা তর্কবিশারদকে আমন্ত্রণ জানানো একেবারেই ঠিক হয়নি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত হট্টগোলের জন্য ভিটগেনস্টাইন সম্পূর্ণভাবে পপারকে দায়ী করেন। বক্তৃতার সময়ে ভিটগেনস্টাইনের পক্ষ থেকে বলা হয়, সেদিন যুক্তিতে হেরে গিয়ে যে ভিটগেনস্টাইন পালিয়ে গিয়েছিলেন, তা নয়। ভিটগেনস্টাইন ভেবেছিলেন পপারের ঐ বক্তব্য শোনা স্রেফ সময় নষ্ট করা ছাড়া কিছু নয়। ভিটগেনস্টাইন অবশ্য পপারের থেকেও রাসেলের ওপর বেশি খেপেছিলেন। কারণ তিনি মনে করেছিলেন রাসেল নিজে পপারকে থামিয়ে দেবেন। কিন্তু প্রকারন্তরে রাসেল পপারের পক্ষ নিয়ে অত্যন্তগর্হিত কাজ করেছেন। তাই পপার মুহূর্তটাকে অত্যন্ত গর্বের মনে করলেও ভিটগেনস্টাইন সেই ১০ মিনিটকে কেম্ব্রিজের ইতিহাসে খুবই বিরক্তিকর, সস্তা এবং মন থেকে মুছে ফেলার মতো ঘটনা মনে করেন।
রাসেল পপারের বক্তব্যের পুরোপুরি সমর্থন করেন বিষয়টা এমন নয়। তবে দর্শনে যে একেবারে কোন সমস্যা নেই সেটা রাসেল মনে করেন না। দর্শন যে শুধু ভাষার জটখোলার কাজ করে এটা বলা মোটেও উচিৎ নয়। কারণ রাসেল ভিটগেনস্টাইনের মতোদর্শনকে শুধু ভাষার খেলা মানতে রাজি নন। রাসেল ১৯১২ সালে দর্শনের সমস্যা নিয়ে একটা পুরদস্তুর বই-ই লেখেন। রাসেল কেন পপারকে সমর্থন করেন তা বুঝা যায়। তাঁরা দুজনেই বিজ্ঞানের সমস্যা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন। শুধু বিজ্ঞান নয়, সমাজ, রাজনীতি, জ্ঞান ইত্যাদি নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছেন, সমস্যা উত্তরণের জন্য নানাবিধ প্রস্তাবনা রেখেছেন। এ জগতে নিশ্চিত কোন জ্ঞান থাকতে পারে কিনা সে ব্যাপারে রাসেল ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। রাসেল কিন্তু ভাষার ধাঁধা মনে করে দর্শনকে সীমিত করতে চাননি। তিনি মনে করেছেন, দর্শন সত্য উদ্ঘাটনের অন্যতম এক উপায়। গণিত, যুক্তিবিজ্ঞান, এবং প্রাকৃতিক ও সামাজিকবিজ্ঞানের সূক্ষ্ম বিতর্কের জায়গায় যে গভীর চিন্তার বিন্যাস থেকেই দর্শনের উৎপত্তি ঘটে। দর্শন আলাদা কোন বিষয় নয় বরং যেখানেই গভীর মননশীল চিন্তা অপরিহার্য হয়ে ওঠে সেখানেই দার্শনিক ভাবনা উদ্ভব ঘটে।
ভিগেনস্টাইনের দর্শনে আসার একটা বিরাট প্রেক্ষাপট ছিল। ক্যাম্ব্রিজে তিনি রাসেলের খুব কাছাকাছি আসতে পেরেছিলেন অবশ্য ভাষাদর্শনের অন্তর্গূঢ় রহস্য উন্মোচনের জন্যই। তবে ভিগেনস্টাইন ভাষা নিয়ে জগত ও চিন্তার মাঝে একটা সেতু রচনা করতে চেয়েছিলেন। এরফলে তিনি প্রথমদিকে জগত ও ভাষার মধ্যে একটা নিস্কষসমসাত্ত্বিকরূপ খুঁজেছিলেন। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে তাঁর চিন্তার মোড় ঘোরে। তিনি পরবর্তীতে ভাষার শুধু সরলরৈখিক গতিপথ বিবেচনা থেকে সরে এসে বহুমাত্রিক গতিপথ আবিষ্কার করেন। ভাষা যেন জীবনের এক বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি। এটা ঠিক ভিটগেনস্টাইন ভাষাকে একটা খেলার সাথে তুলনা করেন। তাই ভাষা কেবল স্থির শব্দই নয় এটা একটা কাজ। সত্যি কথা বলতে কি, দর্শনে কোন হারজিত বলে কথা নেই। দর্শনের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রতিটা তত্ত্বই মূল্যবান পরিস্থিতি সাপেক্ষে। তবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা চলে, দার্শনিক সমস্যাবলে অবশ্যই সমস্যা আছে, এবং তা গভীর অর্থবহ। দর্শন মানে অহেতুক চিন্তার কুটচাল বা ভাষার সমস্যা নয় বরং গভীর একটা অর্থবহ বিশ্লেষণ। সেটা বিজ্ঞান হতে পারে, সমাজ হতে পারে, হতে পারে মানব অস্তিত্বের নানান প্রকরণ কিম্বা চিন্তার ইতিহাস। যাই হোক, যেখানেই গভীর মননশীল ও সূক্ষ্ম বিচার দরকার পড়ে তখনই তাকে বলা হয় দার্শনিক সমস্যা। এ ক্ষেত্রে পপার অবশ্যই এগিয়ে।
সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার, অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

