মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২৫

ভিটগেনস্টাইন রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন?

ভিটগেনস্টাইন রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন?

সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার

অনেকে ভেবে বসতে পারেন অস্ট্রিয়ান দার্শনিক লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন (১৮৮৯-১৯৫১) যেহেতু ক্যামব্রিজ ঘরানার মানুষ তিনি কীভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১)চিন্তায় প্রভাবিত হবেন? আলাদা দু’টো মহাদেশ, বয়সের তারতম্যও অনেক, তারপরে আবার একজন দর্শনের ছাত্র; অন্যজনের বিচরণ সাহিত্য-সাগরে অন্য কথায় বলতে গেলে মানব মনের একান্তভাবের দুনিয়ায়! একজন বিশ্লেষণী দর্শনের নিষ্কষ মরুভূমিতে অন্যজন ভাব-তরঙ্গের আনন্দ সাগরে। জিউস টেলিগ্রাফ এজেন্সি ১৯২৬ সালের ১৩ জুলাই সংখ্যায় লিখেছে, রবীন্দ্রনাথ প্যালেস্টাইনে যাওয়ার পথে ভিয়েনাতে এসেছিলেন ১২ জুলাই। তবে তখন তাঁর সাথে ভিটগেনস্টাইনের দেখা হয়েছিল কিনা সে ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য নেই। তবে রিচার্ড স্মিথ লিখেছেন, ১৯১৩ সালের ১৮ মে রাসেল ক্যামব্রিজ কলেজে ভিটগেনস্টাইন, জি ই ম্যুর, চার্লস পার্সিসেঙ্গার, এবং ম্যাক্টেগার্ড নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন। সেদিন ছিল রাসেলের জন্মদিন। ঠিক চা বিরতির মাঝখানে রবীন্দ্রনাথ গিয়ে সেখানে হাজির হন। মেলিয়ান ফ্লোরেন্স স্টেওয়েল নামে এক ভদ্রমহিলা ও কিছুক্ষণ পর সেখানে হাজির হলেন যার সাথে রাসেল প্রায় দুই ঘণ্টা সাংঘাতিক আলাপ আলোচনায় মত্ত হয়ে গেলেন। তবে রবীন্দ্রনাথের সাথে ভিটগেনস্টাইনের কি আলাপ হয়েছে সে সম্পর্কে কোন তথ্য নেই। তবে এটা ঠিক সেই দিনগুলোতে কিম্বা তারপরে ভিটগেনস্টাইন রবীন্দ্রচিন্তায় নিমগ্ন হয়ে গেছেন। কারণ ভিয়েনা সার্কেলে গিয়ে ভিটগেনস্টাইন রবীন্দ্রনাথের কবিতা উচ্চস্বরে পাঠ করতেন। ভিয়েনা সার্কেল হচ্ছে কিছু বিজ্ঞানের দার্শনিকদের গড়ে তোলা একটা সংগঠন যাদের হাত ধরে জন্ম নিয়েছে যৌক্তিক দৃষ্টবাদ নামে এক অভিজ্ঞতাবাদী বিপ্লবী দার্শনিক চিন্তা। আইনস্টাইনের অতি নিকটের একজন জার্মান দাশনিক মরিজ শ্লিক ছিলেন এই দর্শনের অন্যতম পুরাধা ব্যক্তি। তাঁদের নিয়মিত বৈঠকে ভিটগেনস্টাইন মাঝেমাঝে যেতেন কিন্তু এই নব্য-অভিজ্ঞতাবাদের মূল স্পিরিটের সাথে তিনি বরাবরই দ্বিমত পোষণ করতেন। যৌক্তিক অভিজ্ঞতাবাদ বা এই নব্য-অভিজ্ঞতাবাদ অনেকটাই নিরেশ্বরবাদের অনুলিপন যাকে আমরা নতুন জ্ঞান তাত্ত্বিক ডিসকোর্স মনে করি। ভিটগেনস্টাইন যে এই ধরনের ভাবনা থেকে অনেক দূরে ছিলেন তার প্রমাণ অজস্র। নরম্যান ম্যাল্কম লিখেছেন, তিনি (ভিটগেনস্টাইন ) যখন দ্বিতীয় পর্বে উত্তরণের কথা ভাবছেন তখন এম ড্রুরি নামে একজন পুরনো ছাত্রকে তিনি বলছেন, “আমাকে স্রোতের বিপরীতে তীব্রভাবে দাড় টানতে হচ্ছে। আমি কোন ধর্মীয় মানুষ নই, কিন্তু আমি মনে করি যে কোন সমস্যাই ধর্মের সহযোগিতা ছাড়া মীমাংসা করা সম্ভব নয়”।


সেদিন ছিল রাসেলের জন্মদিন। ঠিক চাবির তির মাঝখানে রবীন্দ্রনাথ গিয়ে সেখানে হাজির হন। মেলিয়ান ফ্লোরেন্স স্টেওয়েল নামে এক ভদ্রমহিলা ও কিছুক্ষণ পর সেখানে হাজির হলেন যার সাথে রাসেল প্রায় দুই ঘণ্টা সাংঘাতিক আলাপ আলোচনায় মত্ত হয়ে গেলেন


আমার ধারণা, হয়তো এতক্ষণে সবাই বুঝে গেছেন রবীন্দ্রনাথ কেন ভিটগেনস্টাইনের প্রিয় মানুষ হয়ে ওঠেন। তবে এই আলোচনার আগে দেখা দরকার ভিটগেনস্টাইন আদতে কীভাবে চিন্তার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেছেন। তাঁর সাথে রবীন্দ্রনাথের মিল কীভাবে সম্ভব, এটা অনেকের কাছে প্যারাডক্সের মতো মনে হলেও সত্যি।
ভিটগেনস্টাইন নিয়ে সোজাসাপ্টা একটা চাউর আছেঃ তিনি প্রথম দিকে ছিলেন কঠোর অনাপোসী, জগত ও ভাষার মধ্যে এক ধরনের সমপাতনিক সম্পর্কে বিশ্বাসী কিন্তু পরবর্তীতে এর মাঝে প্রবেশ করেছে মানব মনের আরও কিছু অনুষঙ্গ যেখান থেকে শুরু হয়েছে ভাষা তাত্ত্বিকতার উত্তর-আধুনিক সুত্রমুখ। সহজ করে বললে, ট্রাক্টেটাস (১৯২১)-এ আমরা যে ভিটগেনস্টাইনকে পাচ্ছি ইনভেস্টিগেশনে ( ১৯৫৩) সে আবার আলাদা। ভাষা ও জগতের মাঝে এক ধরনের দরকষাকষির সম্পর্কে বিশ্বাসী ছিলেন ভিটগেনস্টাইন ট্রাক্টটেটাসে; কিন্তু পরে ইনভেস্টিগেশনে তাঁর মনে হয়েছে ভাষা হচ্ছে জীবনের মতো বহুমাত্রিক চেতনায় উদ্ভাসিত বিবিধগ্রাহিতা। ভাষা যেন বহুতল বিশিষ্ট ভবনের মতো বহু-স্তরী যার প্রতিটা কক্ষে থাকে নানাবিধ সুখ-আনন্দ বেদনার গল্প। একটা শব্দের অবস্থাভেদে কত বিচিত্র রকমের অর্থ হয়ে থাকে। এই বিবিধ বৈচিত্রময়তাই ভাষার ধর্ম। একটা শব্দ একটা অর্থ বহন করার যে সরলরৈখিক মানসিক ব্যবস্থাপনা আছে তা নিয়ে উল্টে দেন। ভাষা যেন ছোট্ট এক রুমের কামরা থেকে বের হয়ে বেরিয়ে পড়ল অনন্তের পথে, “ তাই লিখি দিল বিশ্ব নিখিল দু বিঘার পরিবর্তে”।


যারা ভিটগেনস্টাইন সম্পর্কে কৌতূহলী তারা জানেন কতটা দুর্বোধ্য আর রহস্য ঘেরা মানুষ ছিলেন তিনি! এই দুর্বোধ্যতার ব্যাপারটা এমন কি তাঁর এক সময়ের গুরু বাট্রান্ড রাসেলও টের পেয়েছেন বেশ পরে। এ ছাড়া তিনি যাদের সাথে নিয়মিত বসতেন, আড্ডা দিতেন এমনকি বছরের পর বছর চলাফেরা করতেন তাদেরও এক সময় ভুল ভাঙে, “ভিটগেনস্টাইন আদতে আমাদের লোক নয়”।


তবে এরকম করে তাঁকে দুই ভাবে বিভাজন করা হলেও বস্তুত এই বিভাজন নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা মনে করেন ভিটগেনস্টাইন পরে যা ছিলেন আগেও তাই, যথা পূর্বং তথা পরং।কারণ ভিটগেনস্টাইন ছিলেন কিছুটা অস্পষ্ট এক খ্যাপাটে মানুষ। নরম্যান ম্যাল্কম তাঁর চিন্তা-বোধ নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন “ভিটগেনস্টাইনঃ এ রিলিজিয়াস পয়েন্ট অব ভিউ” বইয়ে। নরম্যান বলতে চাইছেন, তাঁর ধর্মীয় চিন্তা ছিল অত্যন্ত গভীরে এবং ব্যক্তিগত জীবনেও এর অনুশীলন ছিল দৃশ্যমান।
যারা ভিটগেনস্টাইন সম্পর্কে কৌতূহলী তারা জানেন কতটা দুর্বোধ্য আর রহস্য ঘেরা মানুষ ছিলেন তিনি! এই দুর্বোধ্যতার ব্যাপারটা এমন কি তাঁর এক সময়ের গুরু বাট্রান্ড রাসেলও টের পেয়েছেন বেশ পরে। এ ছাড়া তিনি যাদের সাথে নিয়মিত বসতেন, আড্ডা দিতেন এমন কি বছরের পর বছর চলাফেরা করতেন তাদেরও এক সময় ভুল ভাঙে, “ভিটগেনস্টাইন আদতে আমাদের লোক নয়”। এ ব্যাপারে জার্মান দার্শনিক রুডলফ কারনাপের বিস্তারিত অভিমত আমি নিবন্ধের কিছু জায়গায় আলোচনা করবো। অনেকেই অনুমান করতে পারেন ভিটগেনস্টাইন তাঁর চিন্তার বাঁক বদল করেছেন যার ফলে তাঁকে মূলত দুই পর্বে ভাগ করা হয়ে থাকে, কিন্তু অনেক গবেষক দেখিয়েছেন আসলে ভিটগেনস্টাইন একই আছেন, শুধু আমরা তাঁকে চিনতে পারি নি। খুব সতর্ক পঠনের ভেতর দিয়ে দেখা যাবে তাঁর চিন্তার গতি সরলরেখা বরাবর, কাজেই পূর্ব ও উত্তর ভিটগেনস্টাইন বলে যে তথাকথিত বিভাজন আমরা করে থাকি সেটা অমুলক। তবে যেভাবেই হোক এটা বেশ আশ্চর্যের ব্যাপার যে ভিটগেনস্টাইনের চিন্তার ওপর রবীন্দ্রনাথের ভাবনা সাঙ্ঘাতিক প্রভাব রেখেছে।
আলোচনার শুরুতেই বলে রাখি, বিখ্যাত জার্মান বিজ্ঞানী ও দার্শনিক মরিজ শ্লিক ভিটগেনস্টাইন সম্পর্কে বলেছিলেন, তাঁর দৃষ্টিতে ভিটগেনস্টাইন ছিলেন গোটা বিশ্বের সর্বকালের সেরা মেধাবীদের একজন। অন্য দিকে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমাদের ধারণা নিশ্চয় খুব বেশি অস্পষ্ট নয়। এ দুজনের চিন্তা কোথায় গিয়ে অধিক্রমিত হয়েছে সেটা বেশ কৌতূহলের বিষয়। এসবের তথ্য, প্রমাণ এবং কীভাবে, কখন এমন কি কেন এই ঘটনা ঘটেছিল তাই নিয়েই আজকের কয়েকটা কথা। এ সংক্রান্ত বই, তথ্য, এবং দুস্প্রাপ্য ডকুমেন্ট দিয়ে সহায়তা করেছেন আমার জার্মান বন্ধু রেইনার এবার্ট, তার প্রতি রইল আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা।
দর্শনের বিশ্লেষণী শাখা, ভাষা দর্শন, সমাজ চিন্তা এমন কি ধর্মবিষয়ক আলোচনায় ভিটগেনস্টাইন এক অনন্য নাম। উনবিংশ শতাব্দির শেষ দশকের কথা। অষ্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা তখন সাংস্কৃতিক বলয়ের এক উচ্চাসনে। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় ভিয়েনা তখন সবার কাছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এমনি এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ১৮৮৯ সালের ২৬ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন লুডভিগ জোসেফ জোহান ভিটগেনস্টাইন। এলানজ্যানিকেরও টুলম্যানের মতে, ভিয়েনা সে সময় ছিল সংস্কৃতির এক উর্বর ভূমি। সাহিত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত, স্থাপত্যবিদ্যা, মনোবিজ্ঞান কিম্বা দর্শনে ভিয়েনার নাম ছড়িয়ে পড়ে গোটা ইউরোপে। এ কারণে বলা হয়ে থাকে ভিটগেনস্টাইন ছিলেন সময়ের সৃষ্টি।
১৯০৮ সালে তিনি মেনচেষ্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু করেন অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া। কিন্তু এটা পড়তে এসে তাঁর ভালো লাগতে শুরু করে দর্শন আর গণিতশাস্ত্র। এবং ঠিক এ সময় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয় জার্মান গণিতবিদ গটলব ফ্রেগের। ফ্রেগে ছিলেন অসম্ভব মেধাবী একজন গণিতবিদ তথা যুক্তি বিজ্ঞানী। তাঁকে বিশ্লেষণী দর্শনের জনকও বলা হয়। ফ্রেগে ভিটগেনস্টইনের পরামর্শ দেন দর্শন কিম্বা গণিতশাস্ত্র জানতে হলে কেমব্রিজের অধ্যাপক বাট্রান্ড রাসেলের কাছে যাওয়াটাই উত্তম হবে। রাসেলের জনপ্রিয়তা বলতে গেলে তখন মধ্যগগনে। সেটা ছিল ১৯১১ সাল। প্রথম দেখায় ভিটগেনস্টইনকে রাসেলের মনে হয়েছে, “একজন অজানা আনাড়ি জার্মান তাঁর সামনে একদিন হাজির হল, দেখতে বেশ খানিক নির্বোধ মনে হলেও সে ছিল তীক্ষ্ণ বুদ্ধির একজন যুবক”। রাসেল তাঁর বিচক্ষণতায় মুগ্ধ হলেন সামান্য কিছু দিনের মধ্যে। গাণিতিক যুক্তি ধারার ওপর তাঁর সুতীক্ষ্ণ নজর ছিল। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই রাসেলও তাঁর দিয়ে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। দুজনের যৌথ চিন্তায় এক নতুন দর্শন স্রোতের ধারা সৃষ্টি হয়, যার নাম যৌক্তিক পরমাণুবাদ। জগতকে বুঝতে হলে বুঝতে হবে ভাষার মধ্যদিয়ে কারণ ভাষা জগতের প্রতিবিম্ব। কাজেই পরমাণুর মতো এককের মাধ্যমে বুঝতে হবে ভাষার জটিল কাঠামো, সাথে সাথে জগতের সাংগঠনিক স্তরবিন্যাস। মোটামুটি এটাই দুজনেই এ বিষয়ে অন্তত কিছুকাল সহমত পোষণ করেন।
কিন্তু অল্পকিছু দিন পরেই রাসেলের সাথে ভিটগেনস্টাইনের সম্পর্ক তিক্ততায় মোড় নেয়, তবে রাসেল ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন সমালোচনা সহিষ্ণু ব্যক্তি। তাঁর একটা লেখা সম্পর্কে ভিটগেনস্টাইনের তীব্র মন্তব্য রাসেলকে ভাবিয়ে তোলে। ১৯১৩ সালের ২৮মে রাসেল এক চিঠিতে লিখছেন, “আমার লেখার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাঁকে দেখালাম। সে বলে দিল, এসব যা লিখছো সব ভুল। সে আমার বিষয়বস্তুর আগপাছ না ভেবে বলল যে, ‘এটা চলবে না’। আমি তাঁর সমালোচনা ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারলাম না। তাঁর সমালোচনাটা এতটাই অস্পষ্ট ছিল যা আমার ধরতে কষ্ট হচ্ছিল। তবে আমি একটা বিষয় ভাবছিলাম যে, হয়তো আমারও কোথাও ভুল হতে পারে, যা আমি ধরতে পারছি না।এর জন্য আমার তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানোটা ঠিক হবে না। তবে এটা ঠিক আমি বেশ খানিকটা মনোবল হারিয়ে ফেললাম”। এর তিন বছর পর এক চিঠিতে ভিটগেনস্টাইনকে রাসেল লিখলেন, “আমি সত্যিকার অর্থে আজ বুঝলাম আমার চিন্তার সেই বিষয়বস্তু ভুল ছিল। ভিটগেনস্টাইনই ঠিক ছিল”। মানুষের জ্ঞানের উপায় ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে রাসেল পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে নতুন করে একটা বই লেখেন যার নাম, হিউম্যান নলেজঃ ইটস স্কোপ এন্ড লিমিটস। ভিটগেনস্টাইনের গাণিতিক যুক্তি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা রাসেলের থেকে অনেক ক্ষেত্রেই আরও তীক্ষ্ণ ছিল। ভিটগেনস্টাইনের সমালোচনার প্রেক্ষিতে রাসেল সে সময় ৩৫০ পৃষ্ঠার একটা ম্যানুস্ক্রিপ্ট ফেলে দিয়েছিলেন। রাসেল এক বছরের কম সময়ের মধ্যে ঘোষণা দেন, ভিটগেনস্টাইনের শেখানোর কিছু নেই আমার তারপর ভিটগেনস্টাইন ক্যামব্রিজ ছেড়ে চলে যান নরওয়েরজড নামে এক জায়গায়। সেই নির্জন দ্বীপান্তরে একটা কাঠের ঘরও বানান নিজের হাতে। তবে সেখানেও বেশি দিন তিনি থাকেন নি।
ভিটগেনস্টাইন অল্প কিছু দিনের মধ্যেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। অস্ট্রিয়-হাঙ্গেরির সেনাবাহিনীর একজন সদস্য হিসেবে যুদ্ধে গিয়ে অল্প কিছু পরেই যুদ্ধবন্দি হন। এবং বন্দীদশায় তিনি দর্শনের ওপর বিশেষত গণিত ও যুক্তিবিজ্ঞানের ওপর চিন্তা শুরু করেন। সাথে সাথে তিনি নীতিবিদ্যা ও জীবনের অর্থ নিয়েও ভাবেন। ঠিক এ সময় তিনি অদ্ভুত ধরনের একখানা বই লেখেন, ট্রাক্টট্যাটাস-লজিকো-ফিলসফিক্যাস নামে। রাসেলের ভূমিকা সম্বলিত মাত্র কুড়ি হাজার শব্দের ছোট্ট এই বইটা প্রকাশিত হয় যুদ্ধ শেষ হলে ১৯২১ সালে। প্রথমে জার্মান ভাষায় পরের বছর ইংরেজিতে। তবে উল্লেখ্য রাসেলের লেখা ভূমিকাতে তিনি দারুণভাবে ক্ষুব্ধ হন। ক্ষুব্ধ হবার কারণ রাসেল যেভাবে ভিটগেনস্টইনকে বুঝেছেন জগতের সাথে ভাষার সম্পর্ক বিষয়ক ব্যাখ্যা নিয়ে, আদতে ভিটগেনস্টইন সেটা বুঝাতে চাননি। ভিটগেনস্টইন মনে করেন, জগতের সাথে ভাষার একটা অনুরূপতার সম্পর্ক আছে। মানে এমন কোন শব্দ নেই যা জগতে অস্ত্বিত্বশীল বস্তুকে নির্দেশ করে না। শব্দ হচ্ছে ভাষার একক কাঠামো, ঠিক যেভাবে আমারা ইট দিয়ে একটা বিল্ডিং বানিয়ে তুলি। এটাকে ভিটগেনস্টইন পিকচার থিওরি বলে অভিহিত করেন। এসব কথা দিয়ে তিনি এটাই বুঝাতে চেয়েছেন, আমরা যা বলি তা পরিষ্কার করে বলা উচিৎ, যে বিষয়ে বলা যায় না সে বিষয়ে চুপ করে থাকা উচিৎ। তিনি বইটাতে মোট সাত ধরনের বাচনিক বিন্যাস ঘটিয়েছেন বিভিন্ন উপ-বচনের সন্নিবেশ করে। ট্রাকটেটাস সম্পর্কে এটাই সাধারণ মানুষের বক্তব্য। কিন্তু বইটাতে বেশ একটা রহস্য কিন্তু রয়ে গেছে শেষ কয়েকটা পৃষ্ঠায়। সেটাই আমাদের এই আলোচনার মোড় ঘুরাতে পারে। ভিটগেনস্টাইনের এই ভাষাতাত্ত্বিক কঠোর অনুশাসনের বাইরে নীতিবিদ্যা, ধর্ম, অধিবিদ্যা কিম্বা নন্দনতাত্ত্বিক পরিকাঠামোর স্থান কোথায় হবে, সেটা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তৃতীয় বারের মতো বিলেত যান ১৯১২ সালের মে মাসে। এ সময় খুব অল্প দিনের মধ্যেই তিনি সেখানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর বই গীতাঞ্জলি ম্যাকমিলান এন্ড কোম্পানি থেকে ছাপা হয় সং অফারিংস নামে। অনুবাদের একটা বড় অংশ সহযোগিতা করেন আইরিশ কবি ইয়েটস। এটা সবার জানা। আর এ কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন বৃটিশ পেইন্টার উইলিয়াম রোটেনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথের সাথে যার আমৃত্যু বন্ধুত্ব ছিল। লয়েস ডিকেন্সন নামে একজন লেখক ক্যামব্রিজের কিংস কলেজে এক সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে উপস্থিত হন বাট্রান্ড রাসেল। রবীন্দ্রনাথ নিজের কণ্ঠে সেদিন কিছু গান শোনান। ডিকেন্সন সেদিনের সন্ধ্যার কথা জানাচ্ছেন এভাবে, “ জুনের সেই সন্ধ্যায় ক্যাম্রিজের বাগান। আমি আর রাসেল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বসলাম সেখানে। সে তাঁর কয়েকটা কবিতা আমাদের শোনালো। তাঁর অপূর্ব কণ্ঠস্বর এবং অদ্ভুত বাচন ভঙ্গিমা যেন সমস্ত আঁধারময় পরিবেশকে প্লাবিত করে তুলল। রাসেল যখন কথা বলতে শুরু করলো তখন মনে হল অন্ধকারের ভেতর হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো আলো জ্বলে উঠলো। অসম্ভব নীরবতা শেষে রবীন্দ্রনাথ বলে উঠলো রাসেলের এই কথাগুলো তাঁকে চমৎকৃত করেছে। আদতে যেন রবীন্দ্রনাথ ডুবে গেছেন উচ্চমার্গিক চেতনার চুড়ায়”। এ এরনসন মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমা বিশ্বে এতো বিপুল জনপ্রিয় হয়ে উঠে ছিলেন এ কারণে যে, সেখানকার মানুষ বস্তুজীবনের একঘেয়েমিতে ছিলেন অতিষ্ঠপ্রায়। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান তাদের মনে এক সীমাহীন প্রশান্তি এনে দিয়েছে। তারা খুঁজে পেয়েছে জীবনের এক ভিন্ন অর্থ।


মানুষের হৃদয়ে যে ঐশ্বরিক ভাবনা একান্তে লুকিয়ে আছে তারই আলংকরিক প্রতিফলন এই নাটক। রাজাকে দেখা না গেলেও রাজা সব জায়গায় থাকেন, তিনি আমাদের সকল স্পর্শে ধরা দেন।


রবীন্দ্রনাথের রাজা নাটক প্রকাশিত হয় ১৯১০ সালে। ১৯১৪ সালে এটা অনুবাদ করা হয় দ্যা কিং অব দ্যা ডার্ক চেম্বার (The King of the Dark Chamber) নামে। এটা দুর্বল অনুবাদের কারণে অনেকেই এর মূল বিষয়বস্তু ধরতে পারেনি প্রথমে।ভিটগেনস্টাইনও এটা পড়েছিলেন। এর অনুবাদ করেছিলেন একজন বৃটেনে অবস্থানরত ভারতীয় ছাত্র। তিনি কয়েক দিনের মধ্যে পুরো বইটা বাদ দিয়ে কিছু কিছু অংশ ভুলভাল অনুবাদ করেন তার একডেমিক পারপাসে, রবীন্দ্রনাথ নিজে খুব বিরক্ত প্রকাশ করেন এ জন্য। তবে পরে রবীন্দ্রনাথ নিজেই এটা অনুবাদের দ্বায়িত্ব নেন। ১৯২১ সালের ২৩ অক্টোবর পল এঙ্গেলম্যানের কাছে এক চিঠিতে তিনি লিখছেন, তিনি ডার্ক চেম্বারের আগামাথা কিছু বুঝতে পারছেন না কারণ এর ভেতর দিয়ে কবি যা প্রকাশ করতে চেয়েছেন তা প্রকারন্তরে তেমন অর্থপূর্ণ কিছু হয়ে ওঠেনি। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীতে ভিটগেনস্টাইনের চিন্তার বাঁক নিতে থাকে। এবং এই বাঁকের ফলে কী কী বিষয় তাঁর চিন্তায় অন্তর্ভুক্ত হয় সেটা অনুধাবন করা দরকার। এ কারণে রাজা নাটক তথা দ্যা কিং অব ডার্ক চেম্বার-এর বিষয়বস্তুর প্রতি একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক।
“দ্য কিং অফ দ্য ডার্ক চেম্বার” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা একটি নাটক যা ঈশ্বর, শক্তি, সত্য এবং প্রেমের বিষয়বস্তু অন্বেষণ করে। এই নাটকে, কিছু লোক দাবি করে যে ঈশ্বর বলে কিছু নেই এবং সেই ঈশ্বরকে একজন এলোমেলো ব্যক্তি ছদ্মবেশে ধারণ করেছেন। ঈশ্বরের রাজ্যকে শাসন করবে এবং তার রানী সুদর্শনাকে কে বিয়ে করবে তা নিয়ে রাজাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, একজন যুবতী যিনি রাজার অন্ধকার কক্ষে প্রবেশ করেন এবং সেই স্থানের আভায় মোহিত হন। এমনকি রানীরও ঈশ্বর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না, যিনি কেবল একটি অন্ধকার কক্ষে তার সাথে দেখা করেন। অন্ধকার কক্ষের রাজা তাদের অন্ধকার অজ্ঞতা থেকে বোঝাপড়া এবং প্রেমের আলোকিত রাজ্যে পরিচালিত করেন। রাজা এবং তার রানী কি কখনও তাদের ত্রুটিগুলি উপলব্ধি করতে পারবেন এবং তাদের অহংকারী দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করে ঈশ্বরের দিকে ফিরে আসবেন? একটা রূপকীয় আদলে মানুষের মনের গহীনে লালিত আধাত্মবোধের পরিস্ফুটন ঘটেছে এখানে। মানুষের হৃদয়ে যে ঐশ্বরিক ভাবনা একান্তে লুকিয়ে আছে তারই আলংকরিক প্রতিফলন এই নাটক। রাজাকে দেখা না গেলেও রাজা সব জায়গায় থাকেন, তিনি আমাদের সকল স্পর্শে ধরা দেন।
এই নাটক প্রকাশিত হবার পর নানামুখী সমালোচনার জবাব দিতে হয় কবিকে। ১৯১৪ সালের ১৫ নভেম্বর সি এফ এন্ড্রজকে তিনি একটা চিঠিতে লেখেন,
“With regard to criticism of my play, The King of the Dark Chamber, that you mention in your letter, the human soul has its inner drama, which is just the same as anything else that concerns Man, and the Sudarsana is not more an abstraction than Lady Macbeth, who might be described as an allegory representing the criminal ambition in man’s nature.” (Tagore, Letters to a Friend, George Allen and Unwin Ltd. p. 49)।
ভিটগেনস্টাইন খুব ছোটবেলায় রোমান ক্যাথোলিক ধর্মের পাঠ গ্রহণ করেন। কিন্তু সেই শৈশব পেরুতেই তাঁর বোন গ্রেটেল তাঁর বিশ্বাসকে নড়বড়ে করে দেয়। তিনি কিছুকাল ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখেন। কিন্তু ২১ বছর বয়সে তাঁর জীবনে একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটে। যখন তাঁর বয়স ২১ বছর তখন ভিয়েনাতে একটা নাটক দেখেন। এর একটা জায়গা ছিল এমন, একজন ব্যক্তির জীবনে ছিল সীমাহীন দুর্দশা যার ফলে সে আত্মহননের পথ বেছে নিল। হঠাৎ সে একটা অলৌকিক শব্দ শুনতে পেলোঃ “তোমার জীবনে খারাপ কিছু নিশ্চিতভাবে ঘটবে না”। এই পৃথিবীতে যাই ঘটুক, যত খারাপ কিছু ঘটে যাক, তার কিচ্ছু হবে না”। এটা শোনার পর ভিটগেনস্টাইনের মনের ভেতর ভীষণ এক আশ্চর্য পরিবর্তন আসে। সেই প্রথম তাঁর জীবনে ধর্মের অলৌকিক বিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।চল্লিশ বছর বয়সে ১৯২৯ সালে ভিটগেনস্টাইন ক্যামব্রিজে “লেকচার অন এথিক্স” নামে একটা বক্তৃতা দেন যে বক্তৃতায় তিনি জীবনে এমন এক অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা দেন যা তাঁকে নিরাপদে রেখেছে। তাঁর কথায়, “আমি নিরাপদ, সামনে যাই ঘটুক আমাকে বিপদগ্রস্ত করবে না”। এটা যেন বাইবেলের গীতসংহিতার প্রতিধ্বনিঃ( ২৩)“এমন কি, যদি আমি কবরের মত গাঢ় অন্ধকারময় কোন উপত্যকা দিয়ে হেঁটে যাই, আমি কোন বিপদের দ্বারা ভীত হব না।কেন? কারণ আপনি যে আমার সঙ্গে রয়েছেন প্রভু। আপনার শাসনদণ্ড আমাকে স্বস্তি দেয়, নিরাপদে রাখে”। তাঁর নৈতিকতার ধারণা সম্পূর্ণভাবে ঈশ্বরের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত। এই কারণেই তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি ইশ্বরের হাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ কারণ ইশ্বরের কাছে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেছেন। ১৯১৪ সালে যুদ্ধের পুরোটা সময় তিনি কাছে রেখে ছিলেন টলস্টয়ের বই “দ্যা গস্পেল ইন ব্রিফ”।তাঁর সহবন্দী মন্টে ক্যাসিনোর সাথে তিনি এই বই পড়তেন। এটা জানা যায়, পুরো যুদ্ধাবস্থায় ভিটগেনস্টইন যে সময় পাড় করতেন তা ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরের কিছু নয়।
অন্য দিকে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন উপনিষদিক ভাবনার বরপুত্র। তাঁর আস্তিক নান্দনিকতা এক সময় ব্রিটেনে তারপর গোটা ইউরোপ সাঙ্ঘাতিকভাবে প্রভাবিত করেছিল। গীতাঞ্জলির প্রতিটা কবিতার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে অধিবিদ্যক চিন্তার অনির্বচনীয় এক ঐশ্বরিক অনুভূতি। কবি পরম সত্তার চূড়ান্ত এক অনুভূতি প্রকাশ করেছেন সীমা অসীমের এক অলঙ্ঘনীয় সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। মানুষের মন সসীম থেকে অসীমের দিকে চেয়ে থাকে, সেখানেই সম্ভবত তার সার্থকতা। বহমান নদী মিশে যেতে চায় সমুদ্রে, সেখানেই তার পরিণতি। মানুষ তার ক্ষুদ্র গণ্ডি পেরিয়ে অসীম আলোকের দিকে যখন ধাবিত হয় অর্থাৎ ক্ষুদ্রজীব বৃত্তির সীমানা টপকিয়ে অনন্তের পথে ধেয়ে যায়, সেখানেই তার চূড়ান্ত পরিণয়। ভিটগেনস্টাইন যাকে ঈশ্বর বলেছেন রবীন্দ্রনাথ তাকে জীবনদেবতা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ যেখানে উপনিষদের মধ্যে সেই সত্তার স্পর্শ পেয়েছেন, ভিটগেনস্টাইন সেখানে পেয়েছেন বাইবেলের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ ১৯১২ সালের পর সারা বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত হয়েছেন এক অনন্য সাধক হিসেবে, ভিটগেনস্টাইনের পরিচয় অনেক এঁকেবেঁকে সেখানেই গেছে। তাঁর দার্শনিক চিন্তার একটা বড় অংশ তাই রবীন্দ্রনাথের সাথে বহুলাংশে সমপাতনিক। রিচার্ড ম্যাকডনৌ ভিটগেনস্টাইন নিয়ে একটা প্রবন্ধে লিখেছেন, ভিটগেনস্টাইন সারা জীবন ভারতীয় মিস্টিক কবি রবীন্দ্রনাথের একান্ত ভক্ত ছিলেন ( Richard McDonough, Wittgenstein’s Affirmation of Mysticism in his “Private Language” Argument)।

সিদ্ধার্থ শংকর জোয়ার্দ্দার, অধ্যাপক, দর্শনবিভাগ, জগন্নাথবিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

লেখক পরিচিতি

সিদ্ধার্থ শংকর জোর্য়াদ্দার
সিদ্ধার্থ শংকর জোর্য়াদ্দার
অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
এ বিভাগের আরও লেখা

ফেসবুক পেইজ

বিজ্ঞাপন

spot_img

জনপ্রিয় লেখা