বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬

বুক পকেটে আমাদের সৌরভ

ফুলহীন একগুচ্ছ ঘ্রাণ

ম্রিতোষ তত্রাচ

“মৃত্যু কি অপূর্ব কোমল আর শান্ত
কুয়াশার মতো মিলিয়ে যাওয়া
নিজেরে নিজেই মুক্ত করার সেকি বিভৎস আনন্দ”
‘সৌরভ’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই একগুচ্ছ ফুলের সুবাসে ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। কবি সৌরভ মাহমুদ্’র সাথে আমার কোন স্মৃতি নাই! কেননা সৌরভ এখন আমার কাছে বর্তমান। কিন্তু সৌরভ মায়ার জালে আটকে পড়া সেই মাছ যে আমাদের স্মৃতির পুকুরজুড়ে সাঁতরে বেড়াচ্ছেন। খিলখিল হাসিটা এবং কনফিডেন্ডলি কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার যে ব্যপারটা তা ছিলো কঠিন। জালে আটকা পড়া মাছের মতোই যে কিনা উত্তপ্ত কড়াইয়ে ছটফট করতে করতে নিজেকে মুক্ত করলেন খুন্তির খোঁচা থেকে কিন্তু ভোজনরসিক তার কিছুই জানলো না, নাকি জানলো? কবিতার মতো বায়বীয় ডানায় উড়তে থাকা চিল, যার পালক খসে গেছে। সৌরভ লিখেছিলো—
‘চলে যায়—তবু যায় না যেনো—
শরীরজুড়ে পারফিউম রেখে যায়—
সৌরভ আমাদের সাথে আছেন। সবসময়ই, এই তো মুখোমুখি আমরা!

 

ডিস্টরশন থিওরি: সৌরভ নামের এক অনন্ত লাইভ ট্র্যাক

সোহাগ আহমদ

সৌরভ মাহমুদ—কবি বলে নয়, বরং কবিতার পরিত্যক্ত সাইলেন্সে যার সাথে আমার প্রথম মুখোমুখি হওয়া। সে মাইক্রোফোন ধরত না, কিন্তু তার চারপাশে সব সময় একটা ফিডব্যাক লুপ চলত—হালকা হুম, লো-এন্ড গুঞ্জন, যেটা বুকের ভেতর ঢুকে স্পিকার কাঁপিয়ে দেয়।

একই মহল্লার বাতাসে আমরা নিশ্বাস নিতাম—সে বাতাস কখনো সিগারেটের ধোঁয়া, কখনো কংক্রিটের ধুলা, কখনো অকারণ বিষণ্নতায় স্যাঁতসেঁতে।
খুব ঘনঘন দেখা হতো না, তবু কিছু মানুষ চোখে না থেকেও মাথার ভেতর হন্ট করে। সৌরভ তেমনই—একটা ব্যাকগ্রাউন্ড ট্র্যাক, যেটা কখনো পজ হয়নি, শুধু ভলিউম কমেছে-বেড়েছে। কিছু সম্পর্ক বার কাউন্ট মানে না, তারা অনুভূতির অ্যাম্পলিফায়ারে বাজে। সংখ্যা সেখানে নোট নয়—নয়েজ। আর সৌরভ ছিল সেই নয়েজ, যেটা বাদ দিলে গানটা ভদ্র হয়ে যায়, কিন্তু সত্য থাকে না।

লিটারেলি আমি যেসব জুনিয়র ভাই-ব্রাদারকে ‘তুই’ বলে ডাকি, তাদের সবাইকে ভালোবেসেই ডাকি। ‘তুই’ আমার কাছে একটা পাওয়ার কর্ড—রাফ, খোলা, বাঁচা। এটা কোনো ভদ্রতার স্কেল নয়, এটা আত্মার ওভারড্রাইভ। সৌরভ ছিল সেই ‘তুই’—নিজের অংশ, নিজের ছায়া, নিজের রিভার্ব।
লোকজন বলে, সৌরভ দুনিয়াবি সব মায়া ছিন্ন করে চলে গেছে। আমি তখন হেডফোন খুলে তাকাই—এই কথা কে বলছে? মায়া ছিন্ন হলে শব্দ থাকে না। অ্যাম্প নীরব হয়। ড্রাম থামে। কিন্তু সৌরভ এখনো কথা বলে। সে কথা বলে লাইনের ফাঁকে, যেখানে কবিতা শেষ হয়ে যায়। সে কথা বলে অকারণ বিষণ্নতায়, যেখানে কোনো লিরিক লেখা হয়নি। সে কথা বলে রাতে হাঁটতে হাঁটতে—হঠাৎ আমি তার হাসি শুনি। একদম ড্রাই সাউন্ড। কোনো রিভার্ব ছাড়াই।

আমি তার জন্মদিন মনে রাখিনি, মৃত্যুর দিনও না। দিন-তারিখ হলো মেইনস্ট্রিম প্লেলিস্ট। ক্যালেন্ডার দিয়ে মানুষকে ট্যাগ করা যায়, কিন্তু উপস্থিতিকে নয়। সৌরভ আমার কাছে এখনো উপস্থিত। সে এখন আর সময়ের মধ্যে নেই—সে সময় হয়ে গেছে। সে অতীত নয়, সে বিট।

তার ভাবনাগুলো এখনো আমার মাথার ভেতরে লাইভ স্ট্রিমের মতো চলে—কোনো বাফারিং নেই, মাঝখানে কোনো বিজ্ঞাপন ঢোকে না। আমার মনে হয়, কবিতার বাইরেও সৌরভ ছিল এক চিন্তাশীল সত্তা—যে প্রশ্ন করে, হঠাৎ চুপ করে যায়, অপ্রস্তুত মুহূর্তে হেসে ফেলে—যেন গানটার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় হঠাৎ সোল বাজিয়ে দেয়। কবি শুভ্র সরকার যখন ভার্চুয়ালি সৌরভকে স্মরণ করেন, তখন বুঝি—স্মৃতি কখনো ভার্চুয়াল হয় না। স্মৃতি হলো সবচেয়ে অ্যানালগ জিনিস। ভিনাইলের মতো—স্ক্র্যাচি, খসখসে, তবু উষ্ণ।
সৌরভ কোনো আর্কাইভে নেই, কোনো সংখ্যায় বন্দি নয়, কোনো ফোল্ডারে সেভ করা হয়নি। সে এখনো চলমান—একটা অনন্ত সাইকেডালিক রক ট্র্যাকের মতো, যার কোনো আউট্রো নেই, শুধু বদলে যাওয়া লুপ। আর আমরা যারা শুনছি—আমরাই তার শ্রোতা, আমরাই তার লাইভ অডিয়েন্স, আমরাই তার সাক্ষ্য।

“কবি সৌরভ মাহমুদ এবং লাশকাটা ঘর “

মাহমুদুল শান্ত

আমি আর সৌরভ তখন ময়মনসিংহ পলিটেকনিকের স্টুডেন্ট, আমরা নিয়মিত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হসপিটালে হাটাহাটি করি, রোগী দেখি, রোগীর আত্মীয়র কষ্ট বুঝার ট্রাই করি। আল্লাহ মানুষকে এতো কষ্টের রোগ কেন দেয় সেটা নিয়া কথা বলি। তখন সৌরভ কবিতা লিখে, টেম্পুতে কইরা গাদাগাদি কইরা কলেজে আসতে আসতে কবিতা লিইখা ফালায় আর তীব্র উৎসাহ নিয়া আমারে দিয়া পড়ায়, আমি দুইএকটা লাইন বাদ দিতে বলি। ক্লাস মিস দিয়া আমরা টাউনহল পাবলিক লাইব্রেরিতে গিয়া বই পড়ি।

এর মাঝে দুই একটা প্রেম সৌরভে হইয়া গেলো, একটাও টিকলোনা! কেউ সৌরভরে বাদ দিলো আবার সৌরভও কাউরে বাদ দিলো। ময়মনসিংহ থাকতে ঠোঁট কাটা একটা মেয়ের সাথে তার ১০/১৫ দিনের প্রেম হইলো, সেই প্রেমের সুবাধে সৌরভ চমৎকার কিছু প্রেমের কবিতা লিখে ফেললো। সৌরভ এই প্রেমটা নিজে থেকেই বাদ দিলো এবং চরম বিরহী হইয়া উঠলো। আমরা হসপিটালে হাটাহাটি বাদ দিয়া এইবার ময়মনসিংহ লাশকাটা ঘরে ডুকলাম, যেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ। ডুম মামারে চা বিড়ি খাওয়াইয়া আমরা তার কাছের মানুষ হইয়া উঠলাম, উনি আমাদের লাশ কাটা দেখাইতে রাজি হইলেন। সেদিনই প্রথম সরাসরি লাশকাটা দেখতে যাওয়া, ৩ টা লাশ! প্রথম লাশ একটা বাচ্চার, তার বাবা মায়ের সাথে ঝগড়া করে বাচ্চাটাকে আছাড় দিয়ে মেরে ফেলছে। আরেকজন বৃদ্ধ ছাগল নিয়া ঝগড়ায় মাথায় আঘাতে প্রাণ গেছে, ৩য় একজন মধ্য বয়সী নারী ফাঁসি নিয়ে মৃত্যু।

লাশ কাটা দেখে দেখে আমরা যখন ক্লান্ত, সৌরভ তখন পড়তে শুরু করলো : শোনা গেল লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে— ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হ’লো তার সাধ;

বধূ শুয়েছিলো পাশে— শিশুটিও ছিলো;
প্রেম ছিলো, আশা ছিলো— জ্যোৎস্নায়– তবু সে দেখিল
কোন্ ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেল তার?…

লাশকাটা দেখে বাড়ি ফেরার পথে আমরা নিশ্চিত হলাম যারা লাশকাটা একবার দেখবে তারা কখনো আত্মহত্যা করতে পারবেনা।

অথচ কি নির্মম আমার বন্ধু কবি সৌরভ মাহমুদের দেহ আমরা ঢাকা মেডিকেলের লাশকাটা ঘরে রেখেছিলাম দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হয়েছিলো তার লাশটা কখন পাবো আমরা। সব শেষে ময়মনসিংহ কবরস্থানে যখন সৌরভকে কবরে নামালাম তার মাথাটাছিলো আমার হাতে, নরম তুলতুলে নরম! সম্ভবত মাথার খুলিটা ওরা ঠিক জায়গায় বসাতে পারেনি। আমার বন্ধু! এ আমার সেই বন্ধু যে বলেছিলো একবার কেউ লাশকাটা দেখলে কখনো আত্মহত্যা করতে পারবেনা শান্ত!

এই শেষ সন্ধ্যা, এই শেষ রাত্রি

আবির আবরাজ

সৌরভের সাথে আমার প্রথম দেখা কবে? মনে নাই। তবে শেষ দেখাটা মনে আছে। এবং আমি এইটা ভুইলা যাইতেই চাইছি সবসময়। বহু বছর ধরে চেষ্টা করেও সফল হই নাই।
ওইদিন সকালটা, দুপুরটা, বিকাল এবং রাত হয়ে পরদিন সকালটাও। এরপর আর কোনোকিছুই একরকম থাকে নাই।
আধাঘন্টা আগে ওর বাসায় আমি, ওর রুমে, বিছানায় বসা। ও আসলো অফিস থেকে আচমকা। কথা বলে গেলো। আধাঘন্টা পর আবারও সেই একই বাসায়।
এবার আর রুমে ঢুকতে পারছি না। ওরে ডাকতেছি উন্মাতাল হয়া, দরজা ধাক্কাচ্ছি। ও রুমেই আছে। তবুও উত্তর দিচ্ছে না। দরজা খুলছে না।
ও কি আমার শত্রু ছিলো? তবে কেনো বন্ধুর রুমে দরজা ভেঙে ঢুকলাম?
ঢুকে কী দেখছিলাম? ভুলে যাইতে চাই। অথচ মাফলারের প্যাটার্নগুলা পর্যন্ত মনে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে আছে।
ফ্যানের সাথে মাফলারটা কীভাবে বাঁধছিলো সৌরভ? এতো কষ্ট হইলো খুলতে। খুব যন্ত্রণা হচ্ছিলো কি ওভাবে ওই অবস্থায় থাকতে ওর? নাকি ততক্ষণে সৌরভ সমস্ত যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে চলে গেছিলো?
কতটুকু আপন হলে ওভাবে শরীর ভেঙে দিয়েছিলো ও আমার ওপর? আমি তো ওরকম কেউ ছিলাম না। নাকি জীবন কখনও এমনও, এরকমই আশ্চর্য অভিজ্ঞতা- কাকে কখন কোথায় এনে দাঁড় করিয়ে দেয়!
ওকে রিকশায় তোলা, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে দৌড়ানো, দৌড়াতে দৌড়াতে মর্গের সামনে!
সৌরভ তো তারপর কই থেকে কই চলে গেলো। ওই রাত, ওই ফিনাইলের গন্ধ আর ওই মর্গের সামনে আমার নিজের ছবিটা ওর লাশের পাশে। এটা কীভাবে চিরস্থায়ী হয়ে গেলো মাথার ভেতর! সৌরভ কতটুকু কাছের ছিলো জানি না। হয়তো অনেক দূরেরই ছিলো- সহজাতই ভুলে যাওয়ার মতো। তবুও কেনো ভুলতে পারি না?
এই শেষ সন্ধ্যা, এই শেষ রাত্রি

সৌরভের জন্য…

উপল বড়ুয়া

আলবেয়ার কাম্যু তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য আউটসাইডার’ উপন্যাসের শুরুটা করেন এভাবে, ‘মা মারা গেলেন আজ। হয়তো বা গতকাল, আমি ঠিক জানি না।’ কেউ যখন মারা যায় তখন অনেক আগে পড়া এই উপন্যাসের শুরটাই মনে পড়ে। আজ এত বছর পরে সৌরভ মাহমুদের স্মৃতিচারণ করতে বসেও এই কথা মনে পড়ছে—‘সৌরভ মারা গেলেন আজ। হয়তো বা গতকাল, আমি ঠিক জানি না।’

এমনও তো হতে পারে, সৌরভ মারা যাননি। এখনও কবিতায় সৌরভ বিলিয়ে যাচ্ছেন। এমনও হতে পারে, সৌরভ মারা যাননি। আমরাই মারা গেছি। সৌরভ আমাদের স্মৃতিচারণ করছেন। সৌরভ কবিতা লিখতেন। অথবা কবিতা সৌরভকে লিখত কবিতা। আমার সময় বিষয়ক এই ‘দ্বিচারী’ ধারনার ভেতর উঁকি দিচ্ছে সৌরভের হাসিমাখা মুখ।

আহত হৃদয়ের সৌরভের আত্মহত্যার খবর শুনে ঢাকা মেডিকেলে ছুটে গিয়েছিলাম রাত্রে। কেন গিয়েছিলাম জানি না। এমন নয় যে, তার সহিত আমার খুব হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। এমনি ‘হাই হ্যালো’ সম্পর্ক। একবার মেরুল বাড্ডায় সৌরভ বাসা খুঁজতে আসছিল। আমিও তার সঙ্গে ঘুরেফিরে বাসা দেখছিলাম। বইমেলাতেও দুয়েকবার দেখা ও কথা হয়েছিল। এটুকু স্মৃতি নিয়ে সৌরভ আজও আমার স্মৃতিতে বেঁচে আছেন। থাকুক এভাবে।

সৌরভকে যে আমার খুব মনে পড়ে, এমন নয়। তবে তার বন্ধুবান্ধবদের দেখলে হঠাৎ স্মৃতি উস্কে দিয়ে বলে, ‘সৌরভ তো তোমারও পরিচিত’। এই যে দেহহারা হওয়ার পরও বন্ধুদের স্মৃতিতে সৌরভ যে বেঁচে আছে, এই তো বিশাল প্রাপ্তি। আমাদের ক’জনের ভাগ্যে এমন জুটে!

ববমার্লের গান –

সোয়েব মাহমুদ

সৌরভ মাহমুদ , বাংলা কবিতায় আসছিল নীরবে কিন্তু যাবার সময় রেখে গেল বব মার্লের গান । সৌরভের সাথে আমার প্রথম দেখা ২০১৫ কিংবা ২০১৬ সালে , আজ তারিখটা মনে পড়তেছে না। শুধু মনে আছে একটা ছোটখাটো ছেলে পেছন থেকে এসে জড়ায়ে ধরে বলছিল ভালোবাসি সোয়েব ভাই । সেই শুরু । এরপর আমাদের দেখা হইতে লাগলো এই শহরের রাস্তায় , উদ্যানে , মাঝনদীতে কখনোও বারে কখনো বা লঞ্চে রিক্সায় ধানমন্ডী মোহম্মদপুরে । প্রচুর আড্ডা হয় নাই কখনো সৌরভের সাথে , কিন্তু প্রচুর কথা হইত ফোনে রাস্তায় দেখায়। কবিতা নিয়ে আলাপ, কবিতার বাইরের জীবন নিয়ে মাঝেমধ্যে আফসোস , মাঝেমধ্যে আমার রাগ কমানোর বার্তা । অনেক বন্ধু হয়েছিল সৌরভের, এটা নিয়ে চিন্তার কথা শেয়ার করতাম কিংবা সৌরভ বলত ভাই এত সহজে বিশ্বাস কইরেন না মানুষরে , যারেই ভালো বলছেন সেই মারছে ভাই , একটু সাবধানে। মাঝেমধ্যে কবিতা পাঠাইত সৌরভ , পড়তাম । মাঝেমধ্যে পাণ্ডুলিপি । কবিতায় অন্তঃ প্রাণ ছেলেটা ২০ তারিখে আমাকে বলল – ভাই আপনার সাথে দেখা করা দরকার , ক্লান্ত লাগতেসে । আমি বললাম আমি কক্স থেকে আসি , দেখা হইব , কথা আছে আমার ও ।

আজকাল সৌরভ নিয়ে লিখতে বললে ট্রমায় থাকি , ভালো লাগে না । ব্যাকস্পেস দেই , মুছে ফেলি । যে ছেলেটা আমারে নিয়ে ভয় পাইত আমি সুইসাইড করে ফেলি কি না! যার সাথে শেষ কথোপকথনে সে বলছিল ভাই আমিই করে ফেলব মনে হয়। আমি বলছিলাম- না সৌরভ পৃথিবীর সব দৃশ্য দেখে ফেলছি আমার চোখে , বয়সে আমি বড় , আমিই সবচেয়ে বেশি বিরক্ত জীবন নিয়া , আমিই যামু আপনার আগে । এরপর আর কথা হয় নাই।

২২ তারিখ , ২২ জানুয়ারি ২০২২ বিকালে একটা ফোন সব এলোমেলো করে দিল আমাদের। সৌরভ ঘড়ির কাঁটার সাথে দৌড়ান বাদ দিয়ে আত্মহত্যার মাঠে শুয়ে পড়লো । আমরা দেখলাম , শীতের জবুথুবু জানুয়ারিতে বৃষ্টি । সৌরভ চলে গেল , ঢাকা মেডিকেলের মর্গে ওর লাশ দেখে জানেন আমি কাঁদিনি , কাঁদিনি একবার ও , শুধু বয়সের ভার আর বৃষ্টির জন্য কিছু ময়লা জমেছিল। আজ চার বছর হয় সৌরভ নেই অথচ প্রতিটি মদের আড্ডার গ্লাসে চিয়ার্সে আছে আজো ।

“কবি সৌরভ মাহমুদ; ম্রিয় এক ঘ্রাণের বেতার”

এনকাই কাইমেন

সৌরভের সাথে আমার খুব বেশি সখ্যতা ছিলো না, আমরা পরস্পরকে আপনি করে বলতাম। একদিন টিএসসিতে পরিচয়। এরপর আমরা অনেক বার অনেকের সাথে মিলেমিশে বসেছি। আমার বাসায় ছোটো ভাই কাফির বাসায়, বাইরেও অনেকবার আমরা আড্ডা দিয়েছি। সৌরভের সাথে আমার কোনো একক দীর্ঘ আড্ডার স্মৃতি নেই। তবে অনেকের মধ্যে বসে থেকেও আমরা অনেক কিছু নিয়ে দুইজনে কথা বলেছি৷ আমার মনে হতো কবি সৌরভ মাহমুদ “ঘুরিয়া ফিরিয়া সন্ধান করিয়া স্বপ্নের কথা বলতে চাই”.

স্বপ্নের কথা বলে বেড়াচ্ছেন, বিপ্লবের কথা বলে বেড়াচ্ছেন শহর থেকে গ্রাম জুড়ে।

সেই সৌরভ মাহমুদ একদিন সন্ধ্যায়,
আমি আর আরিফ রহমান বসে আলাপ করি আমার বাসায়৷ তখন আমরা মানে আরিফ রহমান আর আমি মাঝে মাঝেই সারারাত আমার বাসায় বসে বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ করে বিদ্রোহী কবিতার প্রতিটি লাইনের প্রতিটা শব্দের মিথোলজিক্যাল বাইনারী দাড় করানো তে আমরা কবিতার চ্যাপ্টার ধরে ধরে আলাপ করতাম, মাঝে মাঝে জীবনানন্দ পড়তাম একেবারে ভিন্ন স্টাইলে। আমরা আমাদের আলাপের রের্কডিং ও রাখতাম। আরিফ ভাইয়ের কাছে এখনো থাকার কথা৷

যাইহোক এবার সৌরভের কথা বলি, অনেক দুঃখের কথা বলবো বলেই একটু দম নিয়ে নিলাম।

সৌরভের তখন প্রেমিকার সাথে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। প্রেমিকা মুহাম্মদপুরের দিকে থাকতো দেখে মাঝে মাঝেই মুহাম্মদপুর এসে কল দিতো।

সেদিন আমি আর আরিফ রহমান মাত্র জুত করে বসছি, আলাপ জমতেছে এমন সময় সৌরভ মাহমুদ ফোন করলো, আমি ফোন ধরলাম, সৌরভ বলতেছে, “ভাই আপনি কি বাসায় আছেন? বাসায় থাকলে আমি একটু আপনার বাসায় আসতে চাই, আমার খুব কাদতে ইচ্ছে করছে কিন্তু রাস্তার মাঝে কাদতে লজ্জা লাগছে। ” এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বললো।

আমি শুধু বললাম, আপনি আসেন, আমি অপেক্ষা করছি৷

সৌরভ মাহমুদ বাসায় আসলেন, আরিফ রহমান দরজা খুললো, সৌরভ মাহমুদ আরিফ রহমান এর বুকে ঝাপায়ে পড়ে হাউমাউ করে কান্না শুরু করলো।
আমি রুমের লাইট বন্ধ করে দিলাম, সৌরভ মাহমুদ প্রায় আধা ঘন্টা কান্না করবার পর থামলেন।

আমরা লাইট জ্বালিয়ে ঘর আলো করে অনেকক্ষন কথাবার্তা বললাম৷ আমি বা আরিফ রহমান কেউই কান্নার উৎস জিগ্যেস করলাম না। আমরা বোধহয় একটু বেশিই অধিকার সচেতন হয়ে উঠেছিলাম!
আমরা হয়তো ভাবলাম কবির কান্না লুকানোর অধিকার থাকা উচিৎ৷ আমরা সৌরভ মাহমুদ এর দুঃখ কে এড়িয়ে কবিতা নিয়ে, নজরুলকে নিয়ে বেশ আলাপ করলাম।

আমরা দুইজনেই তাকে খুব আদর করে থাকতে বললাম। কিন্তু কবি বললেন, “আমার যেতে হবে ”

সৌরভ মাহমুদ রাত এগারোটার দিকে বের হয়ে গেলেন আমার বাসা থেকে।
এরপর আমাদের দেখা হয়েছিলো ঢাকা মেডিকেল এর মর্গে ধ্যানমগ্ন অবস্থায়। তার পড়ে থাকা নির্জন দেহ দেখেই আমার মনে পড়লো।

” শোনা গেলো লাশ কাটা ঘরে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে টেবিলের পরে… ”
একদম জীবনানন্দের একটা লাইন জীবন্ত করে দিয়ে ভিন্ন একজন কবি পাড়ি জমিয়েছেন আলোর বিপরীতে।
শুনেছি সৌরভ মাহমুদ এমন ভাবে প্রেমিকার মাফলারে ঝুলে ছিলেন যেন কোনো ভাবেই তার পা মাটিতে না পড়ে। অহংকারী।
ঘাটের উপর অল্প দূরত্বে ফ্যানের সাথে। তিনি চাইলে শেষ মুহুর্তেও পা ফেলে পৃথিবীর বুকে দাড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু না অহংকারী কবি
নির্লজ্জ পৃথিবীর মুখে পা রেখে ঝুলে থাকলেন অনন্তকাল।

তারে নিয়ে একটা কবিতা দিয়ে শেষ করা যাক এই দুঃখের উপাখ্যান।

এলিজি টু কবি সৌরভ মাহমুদ
এনকাই কাইমেন

আমরা মৃত্যুর চাষাবাদ করতাম,
আত্মহত্যার পায়ে বাঁধ দিয়ে উল্লাস করতাম
সৌরভ মাহমুদ এসে বাঁধ কেটে দিতো,
বলতো জীবন হলো প্রবাহিত মহাকাল
তার রয়েছে বেচে থাকবার দায়
মৃত্যুর উপরিভাগে প্রাণের ছায়া ফেলে আমাদের
সমস্ত মৃত্যুফার্মকে ধ্বংস করে দিয়ে স্বপ্নের কথা বলতেন।

আমরা অবাক হয়ে দেখলাম,
সৌরভ মাহমুদ একদিন বাতাসে দুলছে!
আমরা ভাবলাম কবি নাচছে হাওয়ার ঘুমর্নিপাকে
কবি একদিন থেমে গেলেন, আমরা ভাবলাম নিরবতা-

সেই নিরবতা আমাদের কাধে এখন ভারী লাগে
আমরা তার দিকে নুয়ে পড়ি তবু তিনি ধ্যান ভাঙেন না
এই অস্থির পৃথিবীর জীবন দৌড়ে
সৌরভ মাহমুদকে আমরা কদাচিৎ ডাকি,
জন্মদিনে তার কবিতা পড়ি
চলে যাবার দিনে তাকে নিয়ে কবিতাও লিখে দেখেছি
তিনি নির্জনতা ভেঙে কোলাহলে নামেন না।
অচিরেই হয়তো ধ্যানী হয়ে উঠবো
তার সাথে দেখা হলে প্রথমেই জিগ্যেস করবো,
কোনটা বেশি সুস্বাদু কবি? মৃত্যু নাকি প্রেমিকার নাভীফুল?

শীতকাল ও একটি আত্মহত্যা 

শফিক সাঁই

সেইসময়, তখনও এতটা কোলাহল প্রবণ হয়ে উঠেনি জয়নুল উদ্যান । এখানে পার্কের বেঞ্চিতে শুয়ে বসে হুমায়ুন আহমেদ পড়ার দিন সদ্য বিগত । সৌরভ আর আমার বন্ধুত্ব ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে কখনো মেহগনি আর কখনো লক্ষ পাকুড় ঘিরে পাক খাচ্ছে । ‘গামারি’ তখনও আমার কাছে এক অপরিচিত গাছের নাম। সেই অপরিচিত গামারি গাছের কান্ড ছুঁয়ে-ছেনে আমার মমিসিং তখন একটু একটু করে খুলে দিচ্ছে তার সমস্ত আভরণ। এই সব কিছুর মাঝে হঠাৎ নেমে এলো এক দীর্ঘ শীতরাত । ঘুমহীন সেই লাগাতার অন্ধকার কোনোমতে কাটিয়ে যখন মিলিত হলাম ফের ব্রহ্মপুত্রের তীরে, পরষ্পরকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম ।

সৌরভ। আঁধার থেকে আলোতে এসে কবিতা আর রাজনীতির ঘুর্ণিবায়ূতে তাকে উড়তে দেখলাম । আমারও উড়বার সাধ হলো । লুকিয়ে চুরিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা থাকলেও রাজনীতি বিষয়ে তখনো আমি এক নাদান শিশু ।
মধুসুদন হয়ে বিনয় অতঃপর লোরকা থেকে মায়াকভস্কি । ‘মুখোমুখি বসিবার’ এই জীবনান্দ প্রয়াস আমাকে প্রথমবারের মতো উড়তে শিখিয়েছিলো । ডানার উল্লাসে আমরা প্রথমেই চলে যাই তরুণ মার্ক্সের কাছে । সেখান থেকে ভোলগার তীর ধরে খানিক হেঁটে ইয়াংসি নদী , সরোজ দত্তের চোখে দেখে এসেছি লংমার্চ।
আমাদের আড্ডা ঘিরে থাকতো চারু মজুমদার। সিরাজ সিকদার শোনাতেন তার গণযুদ্ধের পটভূমি। আমরা, চোখ বন্ধ করে দেখে নিতাম ‘পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা মুরং রমণী’, কাঁধে রাইফেল।

দর্শনে আমি তার বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিলাম। ফলতঃ বস্তুবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ এইসব খটোমটো নিরস বিতর্কে হার মেনে নেওয়াই ছিলো আমার নিয়তি । সৌরভ কিন্তু এইসব নিয়তি টিয়তিতে আস্থা রাখতো না। সে বলতো জীবন এক পরিকল্পিত ব্যপার। সেইসময় আমি আত্মহত্যার নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারে মনোযোগী হলাম, যেহেতু ‘জীবন এক পরিকল্পিত ব্যপার’ আর অপরিকল্পিত মৃত্যুতে আমার ছিলো ঘোর আপত্তি । বলাই বাহুল্য আমার সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিলো। তাই, ঠিক করলাম জীবনানন্দকে অনুসরণ করতে একদিন কাঁটাতার পেরোব।

সৌরভ এসে ভেস্তে দিলো সেই পরিকল্পনা। তার সরব ও সতেজ উপস্থিতি আমাকে আত্মহত্যা বিষয়ক সব রকম ভাবনা চিন্তা থেকে দূরে ঠেলে দিলো । এরপর আর কখনো ওমুখো হওয়ার কথা ভাবিনি । আমাদের ঠিকানা ছিলো ব্রহ্মপুত্র । একসময় আমরা ঠিকানাচ্যুত হলাম। কর্ণফুলি হলো আমার নতুন ঠিকানা। সৌরভ এক নদীহীন শহরে নির্বাসিত হলো। শুরু হলো জীবনের প্রবল স্রোতকে মোকাবিলা করার প্রয়াস ; যুক্ত হলো নতুন নতুন খড়কুটো- যাকে সে নাম দিয়েছিলো অবলম্বন। সেইসব অবলম্বন, যাদের প্রায় সকলেই ছিলো ধূর্ত ; ধূর্ত ও মাতাল। যারা নিজেরাই সবসময় অবলম্বন খুঁজে বেড়ায় ; এ ডাল থেকে সে ডালে।

আমাদের দেখা হতো শীতকালে। প্রতি ডিসেম্বরে আমরা আমাদের জমানো গল্প-সম্ভার নিয়ে মিলিত হতাম। শান্ত, মিলু, রকিব, জামিল ভাই – আমার কাছে বরাবরই একটা আলাদা জগৎ নিয়ে হাজির হতো। গরহাজির ছাত্রের মতো আমি, আমার যাবতীয় দুর্বলতাসহ তাদের মুখোমুখি হতাম। সৌরভ বরাবরই আমার চেয়ে এক কদম এগিয়ে থাকতো। আমি কখনো তাকে অতিক্রম করার চেষ্টা করিনি। করলেও সফল হতাম কী !

প্রত্যেকের স্মৃতিতেই একটি বীভৎস শীতকাল থাকে। তেমনি এক শীতের শুরুতে আমাদের দেখা হলো। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। যেই সৌরভকে আমি দেখলাম, আমার দশ বছরের স্মৃতি অস্বীকার করলো তাকে সৌরভ বলে মেনে নিতে। প্রথমবারের মতো মনে হলো সৌরভ আমাকে উপেক্ষা করছে। উপেক্ষার বেত্রাঘাত আমি সহ্য করতে পারি না। আমি প্রতিশোধ পরায়ণ হলাম এবং এই উপেক্ষা আর প্রতিশোধের পুনরাবৃত্তির মধ্য দিয়ে আমি রাজধানী ছেড়ে গেলাম।

আমাদের শেষ দেখা ময়মনসিংহে । পার্কে । ইভা, হেম, সৌরভ আর কে কে ছিলো মনে নাই। সেই একই শীতকাল । শীতের মাঝামাঝি। মনে আছে চাদরের আবরণে সৌরভ তার সমস্ত স্থুল হতাশা ঢেকে এসেছিলো । আমরা কবিতা পড়লাম, আর কি কি করলাম মনে নাই। হ্যা, ছবি তুললাম। আমাদের শেষ ছবি ; কে জানতো!

কথা ছিলো, ঢাকায় ফিরে আমরা এক বিরাট বাসা নিব। তাকে একটা সানগ্লাস উপহার দিব বলেছিলাম । আমার পতেঙ্গার ঠিকানায় ওর বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিলো। এরকম অনেক কথাই তো ছিলো! গণমানুষের মুক্তির মিছিলে একসাথে হাঁটার কথা ছিলো । যেই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের দীক্ষা আমরা নিয়েছিলাম আমৃত্যু তাতে অবিচল থাকার কথা ছিলো । কথা ছিলো গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের জাগিয়ে তুলব, শহুরে শ্রমিকদের মাঝে বিলাবো বিদ্রোহের হাতিয়ার।
এই সবকিছুকে এক লহমায় অস্বীকার করে সৌরভ, আমার প্রিয়তম বন্ধু চলে গেলো, স্বেচ্ছায়, গলায় মাফলার পেঁচিয়ে। আর আমাদের যৌথ পৃথিবীতে নেমে এলো এক দীর্ঘস্থায়ী শীতকাল।

সৌরভের সৌরভে

আব্দুল্লাহ আমান

‘না মানে এটা কীভাবে? পুরুষের মগজ তো আর সত্যি এমন নয়! বনি ভাইয়ের কাজ অবশ্য সুন্দর, কিন্তু যে থিমটা তিনি দেখালেন, সেইটাকে ঠিক যুৎসই লাগছে না।’

এতটুকু বলে থামল সৌরভ মাহমুদ। সন্ধ্যার আলো তখন মরে গেছে। মুক্তমঞ্চে অঢেল মানুষের ভিড়। মেট্রোরেল স্টেশনের কোনো গন্ধও নেই তখন বাংলা একাডেমির রাস্তায়। রাজু ভাস্কর্যের মাথার ওপরে ফ্লাইওভারের ছায়াও পড়েনি। আমি, কাফি, সৌরভ মাহমুদ, শেখ মুহাম্মাদ, অ্যালেন সাইফুলসহ আরও কয়েকজন বসে আছি মঞ্চে ওঠার আগে শোভা বর্ধনে বানানো একটা ইটের রেলিংয়ে।

সৌরভ মাহমুদ যখন কথা বলত, মুখে একটা সিরিয়াস ভাব লেগে থাকত এবং সেটা আশপাশের মানুষকে স্বতস্ফূর্তভাবে মনোযোগী করে তুলত তার প্রতি। কপালের ওপর চলে আসা চুল, ঠোঁটের ওপর পাতলা গোঁফ আর মুখে খোচা খোচা দাড়িতে হাস্যোজ্জ্বল মুখে কথা বলার সময় যেন সবাইকে নিজের বৃত্তের ভেতর টেনে নিত। অমোঘ আকর্ষণে সকলকে ধরে রাখার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার।

তখন আমার দুর্দান্ত সময় কাটছে। তুমুল আড্ডাবাজি আর নিজেকে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে নিয়মিত কাজ করে চলেছি হরদম। সৌরভ মাহমুদের সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। এমন এক দেখা হলো ঝিগাতলার বাসায় কোনো এক রাতে। পার্বত্য মেলা চলছে তখন। কাফি আর সৌরভ ভাই দুজনেই গলাঅব্দি জলমগ্ন হয়ে বাসায় এসেছে। মূলত কাফিকে পৌঁছে দিতেই তার আসা। ওই অবস্থাতেই কাজকাম বিষয়ক বেশ আলাপ হলো। তখনকার বর্তমান কাজটা নিয়ে আমি অতটা তুষ্ট ছিলাম না। যেহেতু আরবি-ফার্সি-উর্দুতে দক্ষতা আছে, আমাকে পরামর্শ দিলো তার হাউজে একটা অ্যাপ্লাই করার জন্য। সেখানের বেতনের স্কেল নাকি ভালোই। তার কথা শুনে মনে হয়েছিল, জীবন নিয়ে তার অনেক ভাবনা আছে, অনেক দূর যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। তার সে জীবনবাদি দৃষ্টিভঙ্গি আমাকে ভেতর থেকে নাড়া দিয়েছিল।

তেমনই আরেকটা দিনের কথা। লাভলু ভাইয়ের বাসার ছাদে হ্যাপি নিউ ইয়ারের পার্টি। সৈকত আমীন, সৌরভ মাহমুদ, রহমান মুফিজ, অ্যালেন সাইফুল, কালপুরুষ, শ্রাবণি দিদি, উর্মি, কাফি আর আমিসহ আরও অনেক লোকের হাট বসেছে সেদিন প্রেমবাজারে। অনেক কষ্টে বারবিকিউয়ের চুলা জ্বালানোর হলো। মুরগি পোড়াতে পোড়াতে কানাঘুষা শুনলাম, কিছু ঝামেলা চলতেসে। কিন্তু তার ছিটেফোঁটাও নজরে পড়ল না সদা হাস্যোজ্বল সৌরভ মাহমুদের চোখেমুখে কি কোনো আচরণে। নিজের বেদনা আর জর্জরিত অনুভব পরম যত্নে সকলের অন্তরালে রাখতে জানত সৌরভ। ঘুণাক্ষরেও আঁচ করার উপায় ছিল না, কী চলছে তার অভ্যন্তরে!

আরও একটা দিনের কথা। যে দিনটা না এলেই ভালো হতো।

আমি অফিসে তখন। কাফি ফোন দিল। খবরটা শুনে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। প্রচণ্ড এক ধাক্কায় যেন ভেতর-বাহির একসঙ্গে কেঁপে উঠল। ঢাকা মেডিকেলের সামনে পৌঁছানোর আগেই চোখ ভিজে গেছে আমার।পরিচিত মুখগুলো দেখেই বুঝলাম, কথাটা সত্যি। জাহিদ জগত ভাই হাউমাউ করে কাঁদছে। সৈকত আমীনের মুখটা থমথমে। বেদনা আড়াল করে সৌরভ মাহমুদের জাগতিক ক্রিয়াকর্ম পূরণে ছুটোছুটি করছে। উর্মি এলো তার সঙ্গিকে সাথে করে। সকলের চোখেই জল। কেউ হাউমাউ করে কাঁদছে, কারও কারও অতটা শক্তি না থাকায় উপচে পড়া চোখের জল মুছছে কেবল হাতের চেটোয়, রুমালে বা টিস্যুতে।

নড়বড়ে পা’কে শাসন করে চালিত করলাম মর্গের দিকে। আমার অতটা সাহস ছিল না। সাথের লোকজনের স্রোতই যেন আমাকে টেনে নিয়ে চলল সেখানে। আমি সেদিকে তাকাতে পারছিলাম না। পাশ থেকে হাউমাউ করে কান্নার আওয়াজ আমাকে যেন অন্য কোনো জগতে নিয়ে গিয়েছিল। চারপাশটা তখন অতিপ্রাকৃত বলে বোধ হচ্ছিল; অচেনা আর অসহনীয়।

সেই দিনটা এরপর থেকে আমাকে আর কখনো মুক্তি দেয়নি। তার চেহারা, কথা, কবিতা, আচরণ আর ব্যক্তিত্বের সৌরভ আজও আমাকে ঘিরে রাখে। আমার প্রেমবোধে, সমুখে এগিয়ে চলার দুঃসাহসে এবং নিজের দর্শনে নিজেকে অটুট রাখা ও এগিয়ে চলার দৃঢ়তায় তার উপস্থিতি এতটুকুও অগ্রাহ্য করতে পারি না। সেই সৌরভে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আজও প্রায়শই আমি আউড়ে চলি—

যাওয়ার বিবিধ মুদ্রা রয়েছে মানুষের—
কলমিডোবার পাশে সাঁতারের জীবনী লিখে যায়—
চলে যায়—তবু যায় না যেনো—
শরীরজুড়ে পারফিউম রেখে যায়।

লেখক পরিচিতি

মানুষ ডেস্ক
মানুষ ডেস্ক
শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি মানুষের মনকে করে উদার ও কোমল। যে ব্যক্তি এগুলো হৃদয়ে লালন ও চর্চা করে সে কখনও সমাজবিদ্বেষী কাজ করতে পারে না। সাহিত্য বিভিন্ন যুগের ও বিভিন্ন গোত্রের সমাজ সম্পর্কে আমাদের ধারণা দেয়। বিভিন্ন স্থানের ভাষা শিখতে সহায়তা করে। সাহিত্য মানব মনে প্রেম, বিরহ, সুখের অনুভূতি সৃষ্টি করে। অথচ শিক্ষার অভাবে আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মা-বাবা তাদের সন্তানদের শিল্প ও সাহিত্য পাঠে মন থেকে সম্মতি দেন না।
এ বিভাগের আরও লেখা

ফেসবুক পেইজ

বিজ্ঞাপন

spot_img

জনপ্রিয় লেখা