বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২৬

ছোটগল্প

একটি মুখ, অন্ধকার ঠোঁটের ছায়া
শাখাওয়াত বকুল

হেলাল ঘটকের মুখ আমার স্মৃতিতে নেই, আছে একধরনের ঘোলাটে প্রতিবিম্ব—যেটা যেন কোনো পুরনো আয়নায় জমে থাকা অতীতের ধুলোর মতো, স্পষ্ট নয়, তবু মোচড় তোলে হৃদয়ের গভীরে। তার ঠোঁট অদ্ভুতভাবে উল্টে থাকত, যেন অনুশোচনায় চুইয়ে পড়া শব্দহীন আকুতি। কোনো কথা বলার আগে সে একটু থেমে যেত, একরকম বিষন্নতা মাখা সম্মতির মতো। আমি তখনও বুঝিনি—সেই চুপ করে থাকাটাই ছিল তার ভাষা, তার প্রতিবাদ।

আমি আবির। শহরের মধ্যবিত্ত অরণ্যের এক অলিগলিতে, বিজ্ঞাপনের নীরব আগুনে কাজ করি। দিনশেষে যে মানুষগুলো হাসে, তাদের হাসি বানিয়ে দেই আমি। আর নিজের ভেতর জমিয়ে রাখি প্রাচীন শূন্যতা—যার কোনো বিজ্ঞাপন চলে না, কোনো পোস্টারেও ওঠে না তার মুখ। আমার বাবা ছিলেন মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক—সংখ্যা ও নিয়মের নির্বিকার সন্ন্যাসী। তিনি চেয়েছিলেন আমি যেন হই যুক্তির সরল ধারায় গড়া মানুষ। ভালোবাসার অভাব আমাদের সংসারে কখনও উচ্চারিত হয়নি, কিন্তু প্রতিদিন তার অনুপস্থিতি অনুভব করতাম, ঠিক যেমন অনুভব করা যায় বিদ্যুৎহীন বৈদ্যুতিক বোর্ড—স্পর্শ করলেই ধরা খেতে পারো, তবু কিছু জ্বলে না।

হেলাল ঘটকের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় এক বিকেলে, যেখানে আলো ছিল কিন্তু উষ্ণতা ছিল না। আমার ফুফাতো ভাই সেলিম, যে নিজে বিয়ে করে অবশেষে এক ধরণের রাজনৈতিক নির্জনতায় পৌঁছেছে।

হঠাৎ একদিন বলল—
”তোমারে একটা লোকের লগে দেখা করাই, মানুষটা পাগল টাইপ, কিন্তু মনে সোনা।”

সেই সন্ধ্যায় আমরা তিনতলার ছাদে বসে ছিলাম, শহরের মাথার ওপর তখন একটা ক্লান্ত চাঁদ। হেলাল ভাই সেই আলোয় এক ধরনের পুরনো ফ্যানের মতো মনে হচ্ছিল—যার গায়ে ধুলা জমেছে, কিন্তু এখনও ঘোরে, শুধু শব্দে।

তিনি বলেছিলেন—
“আবির সাহেব, মনের মানুষ পাওয়া যায় না। বানিয়ে নিতে হয়।”

তাঁর এই বাক্যটি আমার ভেতরে ঢুকে পড়েছিল ঠিক এক ফোঁটা কেরোসিনের মতো—আগুন ধরার অপেক্ষায় থাকা এক নিরীহ দ্রব্য। আমি তাকিয়ে দেখেছিলাম তাঁর চোখে একটা অদ্ভুত নৈরাশ্যের আলপনা—যেন তিনি ভালোবাসাকে বহু আগেই এক মৃত নদীর তীরে কবর দিয়ে এসেছেন, শুধু ছায়াটা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন।

তিনি ঘটক ছিলেন, কিন্তু তা শুধুই পেশা নয়—বোধ করি, একধরনের অনুতাপ। তার নিজের জীবন ছিল ছিন্নমূল, ভাঙা। একসময় কৃষক ছিলেন। পড়ালেখা সামান্য হলের বোধের উচ্চতায় অনন্য। সাধারণের যাপন হলের, অসাধারণ নিমগ্নতা ছিলো। এখনো গ্রামে একটি খুচরা দোকান আছে বলে জানতাম—সেখানে চিনি, সাবান, কলম, এমনকি চা- সিগারেট বিক্রি হয়। কিন্তু যেসব পণ্য অদৃশ্য—যেমন আশাবাদ, কিংবা সম্পর্ক—তার সরবরাহ হেলাল ঘটকই করতেন।

তিনি আমার জন্য পাত্রী খুঁজে আনতেন। মেয়েগুলো মফস্বলের; কারো কণ্ঠে ঝরনার ধ্বনি, কারো চোখে ডুবে থাকা নৌকাবিলাস। কেউ কেউ রেডিসনের রিসিপশনে মিলনরেখা খুঁজতো। আমি চুপচাপ তাকিয়ে থাকতাম, মাঝে মাঝে একটা ‘না’ শব্দ করতাম, কখনও কিছুই বলতাম না।

একবার সে নিয়ে গিয়েছিল শুনশান নিরবভূমি খিলবাড়িতে এক মেয়ে—পলির কাছে। মেয়েটির চোখে গোধূলির মতো নীল বিষন্নতা ছিল। সে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের মেয়ে—আমার পরিচিতির বাইরের একজন সরল মানুষের সন্তান। আমার পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু বাবার চোখে সেটি ছিল একমাত্র ‘ত্রুটি’—প্রাইমারি শিক্ষকের কন্যা। আমি নিরুপায়, নীরব থেকে গিয়েছিলাম।

তখন হেলাল বলেছিল—
“আপনারা শহরের লোক। আমরা গ্রামীণ ধান। আপনারা যদি একফোঁটা জল দিতেন, বাঁচত মেয়েটা।”

এই বাক্যটি ছিল নিরীহ, কিন্তু তার ভিতর একটা সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষোভ ছিল। শহরের বুর্জোয়া শ্রেণির দৃষ্টি যে কতটা ঔদ্ধত্যপূর্ণ হতে পারে, তা হেলাল জানতেন। আর আমি? আমি ছিলাম একধরনের নির্লিপ্ত অসহায়তা।

তারপর বহুদিন দেখা হয়নি। আমি নিজেকে নিঃসঙ্গতার একটি করিডোরে আটকে ফেলেছিলাম। চারপাশে বিজ্ঞাপনের রঙিন কোলাহল, আর ভেতরে নিস্তব্ধ এক কোলাহল-শূন্যতা। আমি জানতাম—আমি মরে যাচ্ছি না, শুধু খালি হচ্ছি।

হেলাল ভাই, একটি দুপুর—তীব্র গরমে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা একটা লোকাল বাসের ছবি। আমরা যাচ্ছিলাম রুপপুরের এক মেয়ের বাড়ি। জানালা দিয়ে সূর্য গিলে নিচ্ছিল শহর, এবং হেলালের ঘটকের চোখ ছিল অস্বাভাবিক নীরব।

বাসের জানালার পাশে বসে সে বলেছিল—
“আমার নিজের একটা মেয়েও ছিল। মারা গেছে। গলায় দড়ি। কোনো ছেলেকে নিয়ে না, কোনো পরীক্ষায় ফেল না। শুধু একদিন ঘর ফাঁকা ছিল আর জানালা খোলা।”

আমি চুপ করে ছিলাম। কোনো সান্ত্বনা তখন যথেষ্ট হতো না। আমি জানতাম, কিছু মৃত্যুর কোনো ব্যাখ্যা হয় না—তারা কেবল সমাজের অবচেতনে দগদগে ঘা হয়ে বেঁচে থাকে। হেলালের কণ্ঠে দায় নেই, কিন্তু বিস্ময় ছিল। যেন সে এখনও মেয়ের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ায় তার প্রাণপণে।

আমরা পৌঁছেছিলাম এক গলির ভেতরের বাড়িতে। পাত্রী দেখতে যাওয়া মেয়েটির ছিল কেবল মুখভরা বিষন্নতা—কোনো রঙ ছিল না। তার পাশে বসা বয়স্কা মা বলেছিলেন—
“বুঝেন ভাই, মেয়েদের তো বয়স চলে যায়। বাপের ঘরে তো আর চিরদিন থাকা যায় না।”

এই বাক্যগুলোর মধ্যে আমি একটা গোটা দেশের মুখ দেখেছিলাম। যে দেশ এখনো নারীদের জীবনকে একটা সময়ের ঘড়িতে মাপে। হেলাল কিছু বলল না, শুধু মাথা নাড়ল।

বের হয়ে আসার সময় আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম—
“আপনি কেন করেন এই কাজ?”
সে মৃদু হেসে বলল—
“আবির সাহেব, দুঃস্বপ্ন থামানোর জন্য এক গ্রাম চিনি চাই। আমি সেই চিনি। কারও দুঃস্বপ্নে একটু মিষ্টতা ঢালতে পারি কি না, সেই চেষ্টাই করি।”
আমি তাকিয়ে ছিলাম। সেই মানুষটার মুখে তখন একটা অদ্ভুত আলো—যা বিদ্যুতের না, বিবেকের।

ঠিক তখনই খবর এলো—হেলাল ভাইয়ের ক্যান্সার। শরীরে বাসা বেঁধেছে এক দীর্ঘদিনের বিষ, যাকে চিকিৎসা নয়, ক্ষমা চাইতে হয়।
আমি কিছু টাকা পাঠালাম, ঠিক একটা অপরাধবোধের প্রলেপের মতো। জানতাম, ওতে কিচ্ছু হবে না। কিন্তু না করা মানে নিজের বিবেককে অস্বীকার করা।

প্রায় এক বছর কেটে গেছে। এক বিকেলে অফিসে কাজ করছিলাম, হঠাৎ দেখি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সেই মুখ—একটু শুকিয়ে গেছে, চোখের কোটরে যেন শোকের জমাটবদ্ধতা।

সে বলল—
“ভাই, ভাবলাম মৃত্যুর আগে একবার আপনাকে দেখে যাই।”
তার কণ্ঠে কোনো রকম আবেগ ছিল না—যেন মৃত্যুও একটি খবর, বাসের সময়সূচির মতো।

সে চেয়ারে বসতে বসতে হাপাচ্ছিলো এবং আচমকা বলল—
“আপনাকে ভালোবাসতাম। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছিল না। থাকলেও আজ মনে নেই। কোনদিন জানানো প্রয়োজন বোধ করিনি, আপনি জানতেন না, বুঝতেও পারেননি—সেইটাই তো ভালো।”

আমি কেঁপে উঠেছিলাম। হেলাল ঘটক—যার জীবন ছিল পাত্রী খোঁজার গল্প, সে নিজেই গোপন রাখে তার ভালোবাসা। সে হয়ে ওঠে এই দেশের নিভৃত প্রতিরোধ—যেখানে প্রেম, শ্রেণি, রাষ্ট্র এবং সময় একে অপরকে ভুল বোঝে, অথবা ইচ্ছাকৃত ভুলে থাকে।

মৃত্যুর প্রাক্কালে হেলাল ভাই আমাকে চিঠি লিখেছিলেন। কাগজ ছিল পুরনো রেশনের চাল মোড়ানো থলির মতো—চুপচাপ, ধুলোমাখা, অথচ ভারবাহী। তাতে তিনি লিখেছিলেন—

“আবির ভাই, আমার সব কষ্ট একা ছিল না। কিছু কষ্ট মানুষের জন্য, কিছু রাষ্ট্রের। তুমি যদি পারো, আমার গল্পটা শেষ করো। যেন বোঝা যায়, দারিদ্র্য শুধু অভাব নয়—এ এক ধরণের নিষ্ঠুরতা।”

হেলাল ভাই মারা যান মফস্বলের একটি ক্লিনিকে। গ্যাসট্রিক ক্যান্সার শরীরকে গ্রাস করছিল, আর ডাক্তার বলেছিল—“তেল কম খেতে বলেছিলাম।” যেন কোনো স্বাভাবিক উপদেশ, অথচ সেই গরিব মানুষটির জীবনে তেল নামক বস্তুটার অস্তিত্বই ছিল দোষের মতো।

তাঁর মৃত্যুর আগের রাতে ঘটে এক অদ্ভুত ঘটনা। হাসপাতালের নার্স বলে, রাত দুইটার দিকে তিনি নাকি বিছানা থেকে উঠে বসে “জোসনা পড়ে নেমেছে ধানের গায়ে” বলে কেঁদেছিলেন। এরপর কারো হাত ধরে বলেছিলেন, “তুই জানিস, আমি কোনো পাত্রী খুঁজিনি। আমি খুঁজতাম বাঁচার কারণ।”

সেই রাতেই আমি স্বপ্ন দেখি—একটা গ্রাম, আগুনে পুড়ছে। আর হেলাল ভাই, গায়ে একটা ছেঁড়া কাপড় , দাঁড়িয়ে আছে এক পলির মতো একটা মেয়ের পাশে।
মেয়েটি বলছে, “আমার বিয়ে হবে না।” আর হেলাল তার হাত ধরে বলছে, “তাহলে হবে কী?”

এই প্রশ্নটির উত্তর আমার জানা নেই। কিন্তু জানি—এই প্রশ্নটাই রেখে গেছেন হেলাল ঘটক।

হেলালের মৃত্যুর পর আমি খুঁজতে থাকি তার ফেলে যাওয়া সেই নোটবুক—যেটিতে সে পাত্রীদের নাম লিখত, তাদের বাবার পেশা, মেয়েদের চুলের রঙ, চোখের জল কতটা জমা ছিল—সব নাকি সে লিখত, যেন নিজের দায় সেরে নেয়।

নোটবুক খুঁজে পাই না, কিন্তু এক ছোট কাগজ পাই, যেখানে লেখা—
“রাষ্ট্রের মতো কিছু কিছু কাঠামো, চিরকাল বিয়ের ঘটকদের মতো—যারা মানুষ জোড়ে, সম্পর্ক না।”

এই বাক্যটি আমার ভেতরে একধরনের রাজনৈতিক প্রতিধ্বনি তোলে। আমি বুঝি, হেলাল বুঝে গিয়েছিল—দেশের অচলায়তন কখনও গরিবের জীবনে আলো আনে না। সে শুধু নিয়ন্ত্রণ করে, প্রশ্ন করে, অনুমতি দেয় বা কেড়ে নেয়। ভালোবাসা, খাদ্য, চিকিৎসা—সবই যেন অনুমতির বিষয়।

হেলাল ঘটক মৃত্যুর সময়ে কোনো ‘বিশেষ গল্প’ রেখে যাননি, রেখে গেছেন এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন—“কেন মানুষ বাঁচে?” আর তার উত্তর খুঁজে পাই না, শুধু এতোটুকু বুঝি—যতদিন রাষ্ট্র মানুষকে দারিদ্র্য উপহার দেবে, ততদিন হেলাল ঘটকেরা জন্মাবে, প্রেম খুঁজবে, ব্যর্থ হবে, এবং অবশেষে এক শীতল হাসপাতালের বিছানায় জেগে কাঁদবে—“জোসনা পড়ে নেমেছে ধানের গায়ে।”
হেলাল ভাই আর নেই। আমি তার কথা ভাবি, সেই চুপ করে থাকা মুখ মনে করি। মনে হয়, তিনি ছিলেন শেষ অতিথিপরায়ণ মানুষ, যে নিজে কিছুই পায়নি, তবুও অন্যের জন্য দরজা খোলা রেখেছিল। এক অন্ধকার ঠোঁটের নিচে, যেখানে প্রতিটি শব্দ কাঁপে, ঠিক হেলাল ভাইয়ের মতো।

———-
০৫ মে ২০২৫ খ্রি.
অত:পর
২৩৮/২ লক্ষীখোলা, মুক্তাগাছা, ময়মনসিংহ।

লেখক পরিচিতি

Shakhawat Bakul
Shakhawat Bakul
শাখাওয়াত বকুল কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন । পেশায় শিক্ষক এই লেখক জন্মগ্রহণ করেন ২৮ জুলাই ১৯৭৮ সালে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়। শূন্য দশকের গোড়ার দিকে তাঁর গল্প, প্রবন্ধ,অনুবাদ প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে। তার প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ' ফাঁসির দূরত্বে থাকা মানুষ' প্রকাশিত হয় পরম্পরা থেকে ২০২০ সালের একুশের বইমেলায়। তারপর তিনি অনুবাদ করেন ফ্রানৎস ফ্যানোর বিখ্যাত গ্রন্থ 'ব্ল্যাক স্কিন হোয়াইট মাস্ক'। যার বাংলায় নাম দিয়েছেন 'কালো চামড়া,সাদা মুখোশ', যা প্রকাশিতব্য । এছাড়া তিনি অনুবাদ করেন ন্যাডিন গার্ডিমার, মাও সেতুং, অক্টাভিও পাজ, ওরহান পামুক, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, জি.এম. কোয়েটজির উপন্যাস 'ডিসগ্রেস' সহ অসংখ্য লেখকের কবিতা, গল্প। ২০২২ এর একুশের বইমেলায় দেশ পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থের বই ' ঘাম ও সাদা মেঘের ঘ্রাণ '।
এ বিভাগের আরও লেখা

জমে থাকা অন্ধকারের গল্প

গল্প

ফেসবুক পেইজ

বিজ্ঞাপন

spot_img

জনপ্রিয় লেখা

বুক পকেটে আমাদের সৌরভ