অন্তর্দর্শন ও যাপনের গোপন লড়াই
শাখাওয়াত বকুল
মুলত নিজের সাথে নিজে যেরকমের কথা বলি, নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়া দিয়া তার একটা খতিয়ান বের করা সম্ভব। আবার অনেক সময় মানুষের নিচুতা বা উচুতা দিয়াও নিজের সাথে নিজের একটা কথামালা গাঁথা যায়। বেশিরভাগ সময়ই আমরা অন্যের ভাবাভাবি দিয়া নিজে নিয়ন্ত্রিত বা অনিয়ন্ত্রিত হই।
নিজের সাথে নিজের কথা বলার অভ্যেস আমার সহজাত। নিজের সাথে বোঝাপড়ার পিচ্ছিল পথে বারবার যাই, পিছলে পরে এক ধরনের ‘সুখের মত ব্যথা’ পেয়ে চমকিত হই। এমন নয় যে প্রতিটি বাক্য উচ্চারিত হয়, অনেক সময় তা নিরব ভাষায় ঘটে—চোখের ভেতর, চোয়ালের ধারে, নিঃশ্বাসের ফাঁকে। প্রতিটি কথোপকথনই যেন নিজেকে ব্যাখ্যা করার একটি নিরন্তর প্রয়াস। আর এই চেষ্টার পেছনে আছে একরাশ ক্লান্তি, কিছু অনুরাগ, কিছু ঘৃণা, এবং বিপুল পরিমাণে অসম্পূর্ণতা।
আমরা কেউই আসলে সম্পূর্ণ হয়ে উঠি না। তারচেয়ে আমরা অন্যের সামনে নিজেকে উপস্থাপন করার একটি বেদনাদায়ক অভ্যাসে আটকে যাই। একরকমের আত্মপ্রেজেন্টেশনের শৃঙ্খলে নিজেকে টুকরো টুকরো করি। সেখানেই জন্ম নেয় অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিতে নিজের প্রতি প্রশ্ন। আমি বহুবার বুঝতে পেরেছি, আমার চিন্তাভাবনার অনেকটাই আসলে অন্যদের অনুভব ও মানদণ্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যেন আমি নিজে না, আমি এক বহুতল ভবনের প্রতিফলন, যেখানে প্রত্যেকটি জানালায় অন্য কেউ দাঁড়িয়ে থাকে।
রাজনৈতিক দর্শনে আমি দৃঢ়ভাবে জানি, আমার অবস্থান কোথায়। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে জাতীয়তাবাদ স্পষ্ট বলেই আমি মাথা নোয়াবার নই। কখনো কখনো হেঁটে চলার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে তর্কে জড়িয়ে যাই।
যাপন, প্রতিদিনের বেঁচে থাকা, বারবার আমাকে ভোগবাদের দিকে ঠেলে দেয়। চারদিকে কৃত্রিম চাহিদার উত্তেজনা, এক অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ তৈরি করে—যেখানে আমি চেষ্টা করি নিজেকে মোহমুক্ত রাখতে। সাহিত্যের পেরিফেরিতে নিজেকে বন্দি করে রাখাই যেন আমার মুক্তির উপায়। কিন্তু এই পথে সবচেয়ে বড় বাধা—কানেক্টিভিটি। মানুষের সঙ্গে অবিরত যুক্ত থাকার প্রয়োজনীয়তা আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। আমি একা থাকতে চাই, বইয়ের পাশে, শব্দের ভেতরে—কিন্তু চারপাশের চাপ, অনুরোধ, অথবা প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা আমাকে প্রায়শই বিপর্যস্ত করে।
রাজনৈতিক দর্শনে আমি দৃঢ়ভাবে জানি, আমার অবস্থান কোথায়। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে জাতীয়তাবাদ স্পষ্ট বলেই আমি মাথা নোয়াবার নই। কখনো কখনো হেঁটে চলার সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে তর্কে জড়িয়ে যাই। পরবর্তীতে সেই তর্ক আমাকে বিব্রত করে, কারণ আমি জানি, যার যেটা বুঝবার না, তাকে বুঝাতে যাওয়া একধরনের সময় ও মননের অপচয়। তারচেয়েও বড় কথা, তাতে আমার নিজস্ব পরিমিতিবোধে আঘাত লাগে। এই পরিমিতিবোধ আমার ভাষায়, সাহিত্যে এবং যাপনেও বিদ্যমান। তার বিচ্যুতি আমাকে গভীরভাবে আহত করে।
আরও যেটা আমাকে ব্যথিত করে, তা হলো অপ্রয়োজনীয় আত্মপ্রকাশ। নিজের কথা বলা মানেই সব বলা নয়—তা বুঝি বলেই অধিক মৌনতাও আমাকে পীড়িত করে। আমি চাই এক ধরনের সংহত প্রকাশ, যেখানে মাত্রা, মিতব্যয়, ও আবেগের ভারসাম্য থাকে।
এটা একধরনের সাংগীতিক দ্বন্দ্ব, এক মীমাংসাহীন সংকট—নিজের পছন্দের সাথে নিজের শৈলীর বিভাজন, যেন নিজের ভিতরে আরেকটা আমি, যার সঙ্গে মাঝে মাঝে বোঝাপড়ায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হই।
সাহিত্যের সাথে বোঝাপড়ায় সৎ অসৎ এর ভাবনায়ও আমি প্রায় ক্লিয়ার। পঠন পাঠনে আমি চুজি হলেও, সর্বপ্রকার পাঠে আমার আগ্রহ। সেই আগ্রহ থেকে ট্রাশ লিটারেচার বের করার একটা নিজস্ব পদ্ধতি আছে। সাহিত্যের দিক থেকে আমার বোঝাপড়াও অনেকাংশেই নির্মোহ। আমি দস্তয়ভস্কি, তলস্তয়, গুনরাহ, জি এম কোয়েটজি, অরুন্ধতী রায়, মহাশ্বেতা দেবী, আলবেয়ার কামু আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, তারাশঙ্কর, মানিক , আবুল বাশার, কায়েস আহমেদ, আহমদ ছফা, হুমায়ুন আহমেদ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ফানৎস কাফকা, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, হোর্হে বোরহেস, হারুকি মুরাকামি, ওরহান পামুক, উইলিয়াম ফকনার—এইসব লেখকের ভাষা ও বয়ানের গভীরতা থেকে আলোকিত হই। আল মাহমুদ, আবুল হাসান, শহীদ কাদরী সহ অনেকেই আমার প্রিয় কবি। শহীদুল জহিরের জাদুবাস্তবতা আমাকে আলোড়িত করে, কিন্তু সেই ভাষাকে আমি জ্ঞানত বর্জন করি। এটা একধরনের সাংগীতিক দ্বন্দ্ব, এক মীমাংসাহীন সংকট—নিজের পছন্দের সাথে নিজের শৈলীর বিভাজন, যেন নিজের ভিতরে আরেকটা আমি, যার সঙ্গে মাঝে মাঝে বোঝাপড়ায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হই।
আমি একজন প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষ। পাহাড়ের কাছে না যেতে পারা আমার যাপনের ভেতরে ক্রমাগত কষ্ট হয়ে বাজে। বান্দরবন বা নীলগিরি আমার ভেতরের পরিচর্যার মধ্যেই থাকে, তবু দুর্গাপূর আমার আপাত পিপাসার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। প্রকৃতির সাহচর্যে যে প্রশান্তি, তা আমার কাছে লেখার থেকেও কোন অংশে কম নয় বরং যেই গহন ছুয়ে যাওয়া ভালোবাসা আমাকে উদ্দীপ্ত করে—এমনকি সাহিত্যও যেন কোন কোন সময় তার কাছে মাথা নোয়ায়। এক ধরনের স্নিগ্ধ নির্জনতা আমি প্রকৃতিতে খুঁজি, যা মানবসম্পর্কে বিরল।
মানুষকে আমি বিশ্বাস করতে ভালোবাসি। এটা আমার ধর্মের মতোই—অলিখিত, গভীর, সহজাত। কিন্তু সেই বিশ্বাস ভঙ্গ হলে আমি গভীরভাবে আহত হই। শুধু আহতই নয়, নিজের সরলতার জন্য নিজেকেই দায়ী করি। আমার মধ্যে এক ধরনের আড়ালের অভিজ্ঞান থাকলেও, প্রকাশে আমি স্বচ্ছতা চাই। অন্য মানুষের কৌশলী ভণ্ডামি যখন আমার ওপর প্রয়োগ হয়, আমি তা ধরতে পারি—সেই বোধ আমাকে পীড়া দেয়। আমি নিজেকে বোঝাতে চাই, এই অন্ধকার আমি জানি, তবু প্রকাশে যেন আমি নিজেকে লুকিয়ে না ফেলি । কিন্তু মাঝেমধ্যে তার প্রকাশ হয়েই যায়, আর তখন আমি নিজেকেই দোষারোপ করি—আমার সামান্য অসাবধানতার জন্য।
এইসব অনুভব, বিরোধ, ও দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়েই আমার লেখালেখি। আমি চাই—এইসব নিজস্বতা আমার ভাষায় থাকুক। আমার লেখায় থাকুক এমন এক স্বর, যা অন্যের নয়, একান্ত আমার। ট্র্যাশ লিটারেচারকে আমি ছেঁকে ফেলি নিজের নিয়মে—যেখানে পাঠের শুদ্ধতা আমার জন্য ধর্মের মতোই পবিত্র।
আমার যাপনে আরও একটি আঘাত আসে—যখন নিজের পছন্দমতো কাজ না হওয়া সত্বেও তাতে আমার শারীরিক উপস্থিতি আমার মানসিক প্রজ্ঞা ও নীতি প্রশ্ন করে, যদিও তা সারাবার নয় – যেমন পুরোনো দেয়াল অনাকাঙ্খিত বটবৃক্ষকে শরীরে করে। এই এমভিব্যালান্সের মতো বাস্তবতা আমাকে ক্লান্ত করে, এবং তা আমার স্বাভাবিক মননের ওপর একটি অদৃশ্য ভার রেখে যায়। আমি বুঝি, এই সমাজে সবকিছু পছন্দ অনুযায়ী হয় না, তবু সেই অননুমোদিত অংশগ্রহণ আমাকে নিজস্বতাবোধে আঘাত করে।
এইসব অনুভব, বিরোধ, ও দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়েই আমার লেখালেখি। আমি চাই—এইসব নিজস্বতা আমার ভাষায় থাকুক। আমার লেখায় থাকুক এমন এক স্বর, যা অন্যের নয়, একান্ত আমার। ট্র্যাশ লিটারেচারকে আমি ছেঁকে ফেলি নিজের নিয়মে—যেখানে পাঠের শুদ্ধতা আমার জন্য ধর্মের মতোই পবিত্র।
এই কথাগুলো আসলে কারো জানার জন্য নয়। এগুলো নিজেকে জানার জন্য। নিজের কাছে নিজের ব্যাখ্যা দিতেই এই দীর্ঘ স্বগতোক্তি। কারণ, আমরা যতোটা না অন্যকে বুঝি, তার চেয়ে অনেক বেশি অস্পষ্ট থাকি নিজের কাছেই।
২৭.০৫.২৫

